Read Time:13 Minute, 15 Second

গত ছয় মাসে বিএনপি সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। নিচে তার ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হলো:

বিগত ছয় মাসে বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।

নির্বাচনের আগে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ, সরকারের প্রথম ছয় মাসেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি তো দূরের কথা, উল্টো ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৬১,৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে।

একদিকে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ছয় মাসে প্রায় ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানো—এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারের কর্মসংস্থান নীতির সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করতে হবে।

সরকার শ্রমবাজারের মাত্র ৪ থেকে সর্বোচ্চ ৫% নিয়োগ দেয়, এর বেশি পারে না। পারবে না। বাকিটা নিয়োগ দেয় বেসরকারি খাত, প্রবাসী শ্রমবাজার।

এখন কোন দল দেড়-দুই বছরেই কোটি পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে ধরে নেয়া যায় এসব মিথ্যা আশ্বাস। (আয়রনি হচ্ছে, প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলে হাঁটে-মাঠে রাস্তায়-ঘাঁটে, টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে ট্রাকে সর্বত্র চাঁদাবাজিতে লাখে লাখে বিএনপি কর্মীকে নিয়োজিত করেছে)।

তাইলে দেশের কর্মসংস্থান কীভাবে সম্ভব?

সরকার হবে এমপ্ল্যেমেন্টের ফেসিলিটেটর, এনাবলার। সে পলিসি ইন্টারভেনশন করবে, ফাইনান্স ফ্রেইমওয়ার্ক সাজাবে, ইনফ্রা সাপোর্ট দিবে। কর্মসংস্থান এগিয়ে নিবে বেসরকারি খাত।

অর্থনীতি ও শ্রমবাজার দুইভাগে বিভক্ত। ফর্মাল আর ইনফর্মাল। ফর্মাল খাত শ্রমবাজারের ১৫% নিয়োগ দেয় আনুমানিক। আনফর্মাল খাত ৮৫%। কিছু কমবেশি হতে পারে!

ফর্মাল খাতে মিড ও হাই লেভেল স্কিল লাগে। সরকারের কাজ ইন্ডাস্ট্রি সার্ভে করে আজকের এবং আগামীর স্কিল ডিমান্ড কী কী সেগুলো লিস্টেড করা। এর পরে সে সে স্কিল গুলা তৈরির জন্য ছোট, মাঝারি ও লম্বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট (দক্ষতা তৈরি ও প্রশিক্ষণ) কোর্স তৈরি করা, এর জন্য ট্রেনিং ফেসিলিটি, হাতে কলমে শিক্ষার ফিন্যান্স ও অবকাঠামো তৈরি করা। মানে দক্ষতার পাইপলাইন বানানো। নতুন দক্ষতা ডিমান্ড তৈরি হবে, সেমতে ট্রেনিং কাঠামো ঠিক করা।

অর্থাৎ সরকারকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ যাবতীয় ট্রেনিং একাডেমি ও ইন্সটিটিউটকে নিজেদের অকার্যকর কোর্সের খোলস থেকে বাস্তবের শ্রমবাজারে নামিয়ে আনতে হবে। শ্রম বাজারের সব ডিমান্ডের সাথে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েকে ম্যাপিং করে দক্ষতার বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের পাইপ লাইন তৈরি করাই সরকারের কাজ। বাংলাদেশের বিএনপি-আওয়ামীলীগ টাইপের পুরানা দল গুলা এইটা করতে ব্যর্থ। কারণ তাদের শিক্ষা ও শ্রম খাতের পেশাজীবীরা, নেতারা মাঠের রাজনীতি বুঝে কিন্তু দক্ষতা তৈরির পাইপলাইন বুঝে না। তাই কিছু ডেলিভারি দিতে পারে না।

বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে শিক্ষিত তরুণদের কর্মহীনতার বাজার, মেধার বধ্যভূমি, আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বেকারত্ব তৈরির কারখানা। এটা গতানুগতিক দল গুলোর মান্ধাতার আমলের অকেজো চিন্তার আউটকাম।

অর্থাৎ সঠিক দক্ষতা ও ফাইনান্স প্ল্যানিং করাই সরকারের কাজ। ব্যাংকিং ঋণ সরকার নিবে না, নিবে বেসরকারি খাতে। আর বেসরকারি খাতের বড় ও ভালো প্রতিষ্ঠান স্টক মার্কেট থেকে অধিকাংশ পুঁজি সংগ্রহ করবে। বাকিটা বেসরকারি খাতই এগিয়ে নিবে। সরকার বেসরকারি খাতকে চাহিদামত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সরবারহ করবে, চাঁদাবাজির বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগের যথাযথ নিরাপত্তা দিবে।

ইনফর্মাল খাতে সরকারের মূল কাজ ‘এক্সেস টু ফাইনান্স’ নিশ্চিত করা। মানে আপনি উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের চাহিবামাত্র সহজ শর্তে ঋণ দিবে। ঋণ দাতা যাতে সেটার কিস্তি নিয়মিত ফেরত পায় সে গ্যারান্টি ও নিশ্চয়তা তৈরি করবেন।

আজকে ব্যাংক ঋণের গন্তব্য সরকার নিজেই। ব্যাংক গুলা সরকারকে ঋণ দিয়ে সুদ খায়, বেসরকারি খাতে ঋণ সেভাবে দিচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৫% এ (ইনফ্যাক্ট ৪.৬%)। মানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের যে টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে, ইনফর্মাল অর্থনীতিতে যাবার কথা, সরকার সেটা নিয়ে নিচ্ছে, ইনফর্মাল খাতের ফান্ডিং ডিমান্ড নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে গ্রামের চাষি জেলে খামারিরা আর্থিক পরিষেবায় আওতার বাইরে। ফর্মাল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রামে নাই, আছে ক্ষুদ্র ঋণ, সেখানে সুদের হার বেশি। আছে চাঁদাবাজি। দুয়ে মিলে গ্রামীণ উদ্যোক্তারা অর্থের অভাবে কর্ম তৈরি করতে পারছে না।

যে যার মত হাঁসমুরগি গরু মাছের ফল সবজির খামার করবেন, নার্সারি করবে কিংবা শহরের বিভিন্ন সেবা গ্রামে নিবেন, কিন্তু সরকারের কাজ তার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। চীনের আদলে গ্রাম থেকে পণ্য শহরে আনার সাপ্লাই চেইন ও ই-কমার্স ডেভেলপ করা। আমাদের কৃষি ঋণ নেয় দলীয় কর্মীরা, দালালরা, তারা কিস্তি ফেরত দেয় না। দল ক্ষমতায় আসলে মাফ করিয়ে নেয়। ফলে অন্যের কাছ থেকে বাড়তি আদায় করতে গিয়ে ৯% এর সুদ হয় ১৮%। অর্থাৎ সরকারের যে পলিসি ইন্টারভেনশন, মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট থাকার কথা তা নাই, সরকার এমপ্লয়মেন্ট তৈরির ফেসিলিটেটর হিসেবে আবির্ভুত হতে পারছে না।

এদিকে গ্রামীণ সমাজে স্কিল ডেভেলপমেন্টের ইনফ্রা ও ফ্যাসিলিটি নাই বলে প্রবাসগামীরা উচ্চ ঋণ করে, জমি বেঁচে বিদেশ যান, কিন্তু অদক্ষ হবার কারণে রিটার্ণ সেভাবে দিতে পারেন না। অনেকেই ফেরত এসে বেকার হন।

আপনার দরকার চাষীকে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া। আপনি তা না দিয়ে চাষীকে কাজের সময়ে শ্রমঘন্টার নষ্ট করে এনে সারের লাইনে দাঁড়া করান, ডিলারের পিছনে ঘুরান। তাও ১৩৫০ টাকার সার বেচেন ১৮০০ টাকায়।

আপনার এখনও চাষির, জমির ও জমিতে আবাদকৃত ফলনের ডেটাবেইজ নাই। ফলে কে কি চাষ করলো, কতটুকু করলো, তার কত সার দরকার, কিংবা উৎপাদনের মূল্য ফিরেছে কিনা, কস্ট অফ প্রডাকশন ঠিক রাখতে ভর্তুকি কত লাগবে, বাজার মূল্য কী হবে – এসব ডেটা ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট এবং সেমতে পলিসি ইন্টারভেনশন প্ল্যান আপনার নাই। আপনার পলিটিক্যাল চেইনের টপ টু বটম সবাই প্রায় সবাই আধুনিক মাইক্রো ইকনোমিক ব্যবস্থাপনা জ্ঞান হীন, পলিসি হীন, ফলে আপনার ইশতেহার যেমন কাগুজে, আপনার বাস্তবায়নও গোলমেলে।

এইসব কাজ বাংলাদেশের হিসেবে ইনোভেটিভ মনে হলেও বিশ্বের দেশে দেশে এসব বেসিক সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। আমাদের ঘুণে ধরা প্রসাশন এবং সেকেলে রাজনৈতিক দলের দেশ নিয়ে কোনও ইনোভেটিভ প্ল্যান নাই, ক্ষমতার আগে তারা বলে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী দলকে আল্টিমেটাম দেয় ‘গিভ মি ইউর প্ল্যান।’ এভাবেই চলছে।ফলে আজকে আমাদের দরকার ফ্রেশ আইডিয়ার তরুণদের রাজনীতি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারকে অতিসত্বর ভাতা ও কার্ডনির্ভর পপুলিজম থেকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ফিরে আসতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় এক ডজন অলস ভাতা ( কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, রূপশ্রী, দুয়ারে সরকার, বাংলার বাড়ি, স্বাস্থ্যসাথী, কৃশক সম্মান, শস্য সাথী ইত্যাদি) দেওয়া পরেও ক্ষমতা হারিয়েছেন। কেননা অলস ভাতা কর্ম তৈরি করেনি বরং ছদ্ম বেকারত্ব তৈরি করেছে। দুর্নীতি, অপব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ঘটিয়েছে। আপনি সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে, বাংলাদেশের অলস ভাতার নামে নানাবিধ কার্ডের দোকান খুলেছেন। বিভিন্ন জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির দোকান আসলে ভর্তুকির ভার তৈরি করছে যে ভর্তুকির জন্য আপনি জ্বালানী কিনতে পারছেন না। দিনশেষে এগুলা একেকটা হয়ে উঠবে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও দলীয় কর্মী তোষণের হাতিয়ার, এবং ভর্তুকির বোঝা।

আমাদের দরকার পরিবারের সদস্যদের কর্ম দক্ষতা, আপনি দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড। ইতিমধ্যেই আসছে নানাবিধ অনিয়ম দুর্নীতির খবর। কৃষকের দরকার সার, বীজ, চাষবাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি। সার বরাদ্দে চাঁদাবাজ বসিয়ে আপনি এবার বলছেন নেও তোমার ফারমার কার্ড। বাস্তবে ভাতা নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে কোনও কার্ড লাগে না, লাগে নিখুঁত সিটিজেন ডেটাবেজ যা সময়ের সাথে হালনাগাদ হবে। আপনি ফ্যামিলি কার্ডের একটা স্থির ডেটাবেজ বানাতে বরাদ্দ করেছেন ২০০০ কোটি টাকা।

সবশেষে সরকারকে বলবো- পপুলিস্ট কাজকারবার বন্ধ করুন। এসব না করে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ফর্মাল ও ইনফর্মাল ইকোনমির ফেসিলিটেটিং পলিসি, শহর ও গ্রামে দক্ষতা তৈরির পাইপলাইন তৈরি, এক্সেস টু ফাইনান্স, টুলস টু ওয়ার্ক ইত্যাদি বাস্তব কাজে ফিরে যান।

এভাবে চলতে থাকলে জনগণ বলতে বাধ্য হবে- You came empty-handed & you have no plan at all.

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সংসদীয় দায়িত্ব বণ্টন
Next post ব্রিটিশ নাগরিকত্বের প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘কার এত জ্বালা’
Close