Read Time:7 Minute, 6 Second

পূর্ব লন্ডনের কমিউনিটিতে ‘সম্মানিত’ হিসেবে পরিচিত বাংলাভাষী সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খানকে (৫৪) নারী ও শিশুদের ওপর ধারাবাহিক এবং ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে লন্ডনের একটি আদালত। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) স্নেয়ারসব্রুক ক্রাউন আদালত এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

জানা যায়, গত ১১ বছর ধরে অন্তত সাতজন ভুক্তভোগীর ওপর পৈশাচিক নিপীড়নের দায়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। সাজা অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তির আবেদনের আগে তাকে অন্তত ২০ বছর কারাগারে থাকতে হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় বসবাস করায় তাকে অনেকেই বাংলাদেশি বলে মনে করতেন। তবে তার হাতে নিপীড়িত অধিকাংশই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার সাবেক এই ইমামের কর্মকাণ্ডকে বিচারক লেসলি কাথবার্ট ‘পরিকল্পিত এবং দীর্ঘস্থায়ী যৌন লালসা চরিতার্থ করার অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ প্রমাণ করেছে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাব ও অবস্থানের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির নারী ও শিশুদের টার্গেট করতেন হালিম খান।

এ বিষয়ে বিচারক লেসলি কাথবার্ট সাজা ঘোষণার সময় বলেন, ‘আপনি নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য ক্ষমতার পদ্ধতিগত অপব্যবহার করেছেন। এমনভাবে আচরণ করতেন যেন আপনি আইনের ঊর্ধ্বে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

বিচারক উল্লেখ করেন, হালিম খান সুকৌশলে এমন ভুক্তভোগীদের বেছে নিতেন, যারা লোকলজ্জা বা ধর্মীয় কারণে মুখ খুলতে ভয় পাবেন। তিনি জানতেন যে যদি কেউ অভিযোগ করে, তবে মানুষ একজন ‘সম্মানিত ইমামের’ কথাই বিশ্বাস করবে।

আদালতে ভুক্তভোগীদের দেওয়া জবানবন্দি ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। মামলার শুনানিতে উঠে আসে শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য। আব্দুল হালিম খান ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করাতেন যে তাদের ওপর বদ জিনের আছর আছে। চিকিৎসার নামে তিনি তাদের নির্জন ফ্ল্যাট বা গাড়িতে নিয়ে যেতেন। সেখানে তিনি নিজের ওপর ‘জিন’ ভর করার অভিনয় করতেন এবং এই ছদ্মবেশে তাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালাতেন।

শৈশবে নির্যাতিত হওয়া এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে বিচারককে বলেন, ‘আমার কাছে খান কোনও মানুষ নয়, সে সাক্ষাৎ শয়তান।’

অপর এক ভুক্তভোগী জানান, খান তাকে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার মিথ্যা ভয় দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন কেবল তিনিই এর প্রতিকার করতে পারেন। এরপর তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

লিড প্রসিকিউশন ব্যারিস্টার সারাহ মরিস কেসি বলেন, হালিম খান ভুক্তভোগীদের ওপর ‘আজীবন স্থায়ী ক্ষত’ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের ধর্মবিশ্বাসকে তাদের বিরুদ্ধেই ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছেন।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত খানকে মোট ২১টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ; চারটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর দুবার যৌন আক্রমণ; ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুকে পাঁচবার ধর্ষণ এবং একটি পেনিট্রেশনের মাধ্যমে শারীরিক লাঞ্ছনা।

তদন্তকারী দল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনি রোনান বলেন, ‘আব্দুল হালিম খান নিজেকে একজন সদাচারী ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন এক ভয়ংকর অপরাধী।’

তিনি ভুক্তভোগীদের অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, তাদের এগিয়ে আসার কারণেই আজ এই ন্যায়বিচার সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করে এমন অন্যতম একটি দাতব্য সংস্থা নিশপ্যাক (এনএসপিসিসি)। এই সংস্থার একজন মুখপাত্র এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, বিশ্বাসের জায়গায় বসে শিশুদের ওপর এমন নির্যাতন ক্ষমার অযোগ্য। এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ের পর টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় ধর্মীয় নেতাদের জবাবদিহির দাবি জোরালো হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিল ও নেতারা স্বতন্ত্র ধর্মীয় শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং কঠোর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ সার্জেন্ট সারা ইয়েমস এবং ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর জেনি রোনান ভুক্তভোগীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। ২০১৮ সালে প্রথম অভিযোগ পাওয়ার পর শুরু হওয়া ‘অপারেশন স্পেয়ারব্যাঙ্ক’ এই রায়ের মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখলো বলে মনে করেন তারা।

 

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post মারা গেছেন সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন
Next post ওমানে দুর্ঘটনার শিকার ৪ ভাইয়ের মরদেহ দেশে আসছে মঙ্গলবার
Close