Read Time:6 Minute, 55 Second

ওমানে দীর্ঘ এক যুগের প্রবাসজীবনে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন বুনেছিলেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চার সহোদর। বড় ভাই মুহাম্মদ রাশেদের হাত ধরে একে একে ওমানে পাড়ি জমান অন্য তিন ভাইও। শ্রমিকজীবন পেরিয়ে শেখের গাড়িচালকের চাকরি, গ্রামের বাড়িতে দোতলা পাকা বাড়ি— সবমিলিয়ে বদলে যেতে শুরু করেছিল তাদের ভাগ্য। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

মঙ্গলবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারান চার ভাই। নিহতরা হলেন— রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দাররাজা পাড়ার প্রয়াত মোহাম্মদ হাসানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহিদ।

পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বড় ভাইয়ের হাত ধরে একে একে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চার সহোদর। ভাগ্য বদলাতেও শুরু করেছিল, কিন্তু গত মঙ্গলবার এক রহস্যজনক গাড়ি দুর্ঘটনায় চারজনই প্রাণ হারান। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার আনন্দের আবহ তাদের মৃত্যুতে শোকে পরিণত হয়েছে
রাতেই মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে পরিবার, স্বজন এবং ওমানে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মাঝেও গভীর শোক নেমে আসে। একই পরিবারের চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যু এলাকায় বিরল ও হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। মৃত্যুর খবরে রাঙ্গুনিয়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ। পুরো এলাকা এখন স্তব্ধ।

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বর্তমানে একমাত্র জীবিত ভাই দেশে অবস্থান করছেন। নিহতদের মধ্যে বড় ভাই বিবাহিত ছিলেন, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অন্য এক ভাইও সম্প্রতি বিয়ে করে আবার প্রবাসে পাড়ি জমান।

তাদের ছোট ভাই মো. এনাম জানান, নিহতদের মধ্যে সিরাজ ও শহিদ অবিবাহিত ছিলেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে আগামী ১৫ মে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। তাদের আসাকে ঘিরে পরিবারে আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করছিল। দুই ভাই শপিং করতে বের হলেও শেষ পর্যন্ত ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।

প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় গাড়িটি চালু অবস্থায় স্থির থাকায় এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ায় দমবন্ধ হয়ে চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। স্পন্সরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে সোমবার বা মঙ্গলবার তাদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

ওমানে অবস্থানরত প্রবাসীদের ভাষ্যমতে, বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হন। রাত ৮টার পর তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অসুস্থতার কথা জানান। তিনি নিজেদের অবস্থানও পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থায় তারা নেই। পরে মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

ওমানের স্থানীয় পুলিশ মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় গাড়িটি চালু অবস্থায় স্থির থাকার কারণে এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ। নিহতদের মরদেহ বর্তমানে স্থানীয় পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আমির হোসেন সুমন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাইয়ের এক দিন পর দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু এখন চার ভাই-ই ফিরছেন লাশ হয়ে।’ তিনি জানান, নিহত চার ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। তবে, এখনও তাদের মায়ের কাছে চার সন্তানের মৃত্যুর খবর পুরোপুরি জানানো হয়নি।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান
ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, স্পন্সরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে আগামী সোমবার অথবা মঙ্গলবারের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। আজ সংসদ সদস্য মহোদয় ওই পরিবারে গিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’

আগামী মঙ্গলবার মরদেহ দেশে আসার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post জিন ছাড়ানোর নামে ২১টি যৌন নিপীড়ন, লন্ডনে বাংলাভাষী সাবেক ইমামের যাবজ্জীবন
Next post পর্তুগালে প্রাইভেটকারে ট্রেনের ধাক্কায় এক বাংলাদেশি নিহত, আহত ৪
Close