Breaking
Thu. Nov 5th, 2026

রিপাবলিকানদের শোচনীয় পরাজয়ের পাঁচ মূল কারণ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপুল জয় তুলে নিয়ে পুরো কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

সাধারণত এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে মাশুল গুনতে হলেও, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের বিশাল মাত্রাটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বিগত দুই বছরের নীতির প্রতি জনগণের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই বিপুল সংখ্যক আসন হারানোর পেছনে থাকা পাঁচটি মূল কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুতলয়ে বৃদ্ধি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভোটাররা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের সাথে লড়াই করছেন। গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর নির্বাচনি ময়দানে সেই ক্ষোভ সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে।

নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম, মুদি পণ্যের দাম—সবকিছুর দামই বাড়ছে।’ তিনি আরও জানান, এই নির্বাচনে তিনি নিজের সমর্থন রিপাবলিকান পার্টি থেকে পরিবর্তন করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দিকে নিয়ে গেছেন।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উচ্চমূল্যের ধাক্কায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পণ্যমূল্য ৩.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুসারে, সেপ্টেম্বরে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড ৬.৫২ ডলারে পৌঁছানোর ঠিক কাছাকাছি অবস্থান করছিল অক্টোবরের শুরুতে মার্কিন খুচরা ডিজেলের গড় মূল্য।

ভোটের পর প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮ জন (৭৯ শতাংশ) জানিয়েছেন যে, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য গুরুতর বা মাঝারি ধরনের কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, জরিপে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি মানুষ এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য ট্রাম্পের ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন; তারা বলেছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত এই পণ্যমূল্যের কারণ মূলত প্রেসিডেন্টের নীতি।

২. অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ

পণ্যমূল্য বাড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে দেওয়ার পর তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের এই প্রধান পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর থেকেই মার্কিন ভোটারদের পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।

অধিকাংশ আমেরিকানদের কাছেই এই যুদ্ধ ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাম্পের ‘মেগা’ সমর্থকদের কাছে এটি ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নির্বাচনি প্রচারণার প্রতিশ্রুতির খেলাফ বলেও মনে হয়েছে, কেননা তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন।

একটি ভোটার জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন (৬৩ শতাংশ) বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।

পৃথকভাবে, চারভাগের তিনভাগ ভোটার (৭৪ শতাংশ) জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়টি কংগ্রেসে তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সিদ্ধান্তমূলক বা প্রধান নিয়ামক ছিল।

নির্বাচনের পরদিন সকালে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, এই যুদ্ধ পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে; তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকাতে তাঁর সামরিক হস্তক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

৩. ডেমোক্র্যাটদের সুশৃঙ্খল ও জোরালো বার্তা

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই বিপুল ও সুদূরপ্রসারী বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে তাদের শক্তিশালী কিছু প্রার্থীর উপস্থিতি, যারা বিশেষ করে প্রথাগত রিপাবলিকান ঘাঁটিতে নিজেদের বিশ্বস্ত হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।

তারা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত ইস্যুতে নিজেদের প্রচারণায় কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন।

সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাসের কথা এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যা যথাক্রমে টেক্সাস এবং কানসাসের ভোটারদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুস এক চমকপ্রদ জয় ছিনিয়ে নেন। সাবেক এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার ওপর মূল নজরটি গভীর সাড়া ফেলে। কেননা দেশটির অনেকেই বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অকার্যকর বলে মনে করেন।

মিশিগান আসনে জয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান ধরে রাখা সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আব্দুল আল-সায়েদ ‘রাজনীতি থেকে অর্থ সরাও, মানুষের পকেটে অর্থ দাও’ ধারণাকে মূল স্লোগান বানান।

জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অ্যাসফ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দুর্নীতিকে তাঁর প্রচারণার মূল কেন্দ্রে রেখেছিলেন। ট্রাম্প দু’বার জয়ী হওয়া অঙ্গরাজ্যটিতে ৩৯ বছর বয়সী এই প্রার্থীর নিরঙ্কুশ বিজয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জল্পনা-কল্পনাকে আরও জোরালো করবে।

এমনকি স্বয়ং ট্রাম্পও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করে ফক্স নিউজকে বলেছেন যে তারা ‘বেশ ভালো কাজ করেছে।’

অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কিছু রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটারদের উদ্বেগের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ না দিয়ে দুর্বল প্রচারণা চালানোর জন্য সমালোচনা করা হয়েছিল।

৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়হীনতার প্রভাব

ভোটাররা যেসব ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন—যেমন তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং ইরান যুদ্ধ—সেগুলো সরাসরি প্রেসিডেন্টের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক (অ্যাপ্রুভাল রেটিং) কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল, যা ২০২৪ সালে তাঁকে সমর্থন দেওয়া কিছু অঙ্গরাজ্যকে এই নির্বাচনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

নিজের সমর্থকদের চাঙ্গা করতে ট্রাম্প ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা মনে করেন ব্যালটে তিনি নিজেই প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন।

কিন্তু আমেরিকান রাজনীতিতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে থাকার পর, অনেকেই এই ফলাফলকে প্রমাণ হিসেবে দেখছেন যে, ট্রাম্পের সেই উজ্জ্বল আকর্ষণ বা ব্র্যান্ড ভ্যালু হয়তো ফিকে হতে শুরু করেছে।

ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় নিজেকে রিপাবলিকান প্রচারণার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং তা উল্টো বিপত্তি ডেকে এনেছে বলে মনে হচ্ছে।

ভোটের আগের মাসগুলোতে জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, অনেক আমেরিকানই ট্রাম্পকে তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের মতো নিজেদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোতে আরও বেশি মনোযোগী দেখতে চেয়েছিলেন।

৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মেরুকরণ

দুই বছর আগে কিছু হিস্পানিক এবং কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের রিপাবলিকানদের দিকে ঝোঁকার ফলে ট্রাম্পের বিজয় নিশ্চিত হয়েছিল। কিন্তু এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে তা আবারও পূর্বের জায়গায় উল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্ত সংলগ্ন হিস্পানিক অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় জেলাগুলোর তিনটি হাউস আসনেই জয় নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবার সিনেট প্রার্থীদের ক্ষেত্রে হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ২২ শতাংশেরও বেশি ভোট সরে এসেছে।

ডাটা রিপোর্টার জেফ অ্যাডেলসন বলেছেন, দেশের অন্য যেকোনো প্রধান জনমিতিক গোষ্ঠীর তুলনায় এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি।

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এর কঠোর অভিবাসন অভিযানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনটি এসেছে; যেখানে পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন যে আইসিই সম্পর্কে তাদের ধারণা নেতিবাচক।

পাশাপাশি, কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের দিকে উল্লেখযোগ্য ভোট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

Related Post