Read Time:7 Minute, 31 Second

রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে পাচারের পর রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। পরে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হতো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।

সেখানে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও হামলার দূরত্ব শনাক্ত করতে তাদের একপ্রকার ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এভাবে যুদ্ধে পাঠানো বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মিজানুর রহমানসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। গ্রেপ্তার অন্যজন হলেন মো. আবু তাহের লেন্টু।

চক্রটি নির্মাণকাজে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর পর যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।

গ্রেপ্তার মিজানুর রহমানের বয়স ৫৫ বছর এবং আবু তাহের লেন্টুর বয়স ৫০ বছর।

এসআরবি জানায়, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) গভীর রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই রাতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, “গ্রেপ্তার দুজন পারস্পরিক যোগসাজশে রাজন হোসেন (২১) নামের এক যুবককে নির্মাণকাজে চাকরির কথা বলে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় পাঠান। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে রাজনসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।”

প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে ‘শিকার’ বাংলাদেশিরা
যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশিদের কীভাবে ব্যবহার করা হতো, সে বিষয়ে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক বলেন, “প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য তাদের শিকার হিসেবে পাঠানো হতো। তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হতো। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ কোন জায়গা থেকে এবং কত দূরত্বে থেকে আক্রমণ করছে, তা শনাক্ত করতেই তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হতো।”

রাজনের পরিণতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “যুদ্ধের ময়দানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। একই সঙ্গে তিনি দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চার দিন কষ্ট করার পর হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে আহত অবস্থায় সেখান থেকে পালিয়ে রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন।”

ক্ষতিপূরণ চাওয়ায় হুমকি
এসআরবি জানায়, দেশে ফেরার পর রাজন ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মিজানুর রহমান তার পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন, মারধরের চেষ্টা করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ ঘটনায় রাজনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়। ওই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু
অনুসন্ধানের তথ্য তুলে ধরে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, “চক্রটি উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাচার করে। পরে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুজন কোনো রকমে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। বাকি ৮ জনের মধ্যে দুজন আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্য ৬ জন এখনো যুদ্ধের ময়দানে রয়েছেন।”

এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠানো হয় ২১ জন
এসআরবি জানায়, মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মিজানুর রহমান জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির চেয়ারম্যান। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২১ জন ভুক্তভোগীকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এছাড়া বাকি বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরো দুজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

পাচার চক্রের সঙ্গে হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্যও পেয়েছে এসআরবি।

সংস্থাটির ভাষ্য, ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে বিমানে তুলে দেওয়া পর্যন্ত সব ব্যবস্থা করতেন মূলহোতা মিজান। রাশিয়ায় পৌঁছে নিজেদের প্রকৃত কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে পেরে ভুক্তভোগীরা তাকে ভুল জায়গায় পাঠানোর কথা জানিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাদের অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়নি।

এছাড়া বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে রাশিয়ায় অবস্থানরত আরো দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post সেই দেয়ালে এবার বেগম রোকেয়া, জসীমউদ্‌দীন ও জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি
Next post প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সুখবর পেলেন বিদ্যালয় গড়া দুই হাতহীন আলতাফ হোসেন
Close