বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পদক—যেমন একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদক, জাতীয় পদক, ইত্যাদি —কেবল পুরস্কার নয়; এগুলো জাতির কৃতজ্ঞতার প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে: এই কৃতজ্ঞতা কি সত্যিই জাতির পক্ষ থেকে, নাকি কাগুজে নোটিং-ড্রাফটের ভেতর আটকে থাকা এক আমলাতান্ত্রিক অনুশীলন?
রাষ্ট্র যখন শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেবকদের সম্মান জানায়, তখন সেই প্রক্রিয়া হতে হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো, বর্তমান কাঠামোতে নির্বাচন প্রক্রিয়া অতিরিক্ত আমলানির্ভর; সুপারিশ, যাচাই, ফাইল-চলাচল—সব মিলিয়ে এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রকৃত প্রতিভা প্রায়ই হারিয়ে যায় পরিচিতির জোরে এগিয়ে যাওয়া নামের ভিড়ে। এতে সম্মাননা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি প্রাপকের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো দলীয় প্রভাবের অভিযোগ। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা যদি অঘোষিত মানদণ্ডে পরিণত হয়, তবে পদক আর জাতীয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রদর্শনী। যে রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের গৌরব বহন করে, সেই রাষ্ট্রের পুরস্কার যদি দলীয় আনুগত্যের ছায়ায় ঢেকে যায়—তবে তা কেবল অন্যায় নয়, জাতীয় আত্মমর্যাদার পরাজয়।
সমাধান কী?
প্রথমত, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত সম্মাননা কমিশন গঠন জরুরি—যা প্রশাসনিক ও দলীয় হস্তক্ষেপমুক্ত থাকবে। এই কমিশনের কাঠামো প্রণয়ন করবেন স্বীকৃত জাতীয় ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শাখার বিশিষ্ট শিল্পী-সাহিত্যিক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। মনোনয়ন ও বাছাই প্রক্রিয়া হবে উন্মুক্ত, নির্ধারিত মানদণ্ডভিত্তিক এবং প্রকাশ্য যুক্তিসহ।
দ্বিতীয়ত, দেশ-বিদেশে কর্মরত বাঙালি প্রতিভাদের জন্য সমান বিবেচনা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিভা কখনও স্বদেশি-প্রবাসী বিভাজনে আবদ্ধ নয়। প্রবাসে থেকেও যারা বাংলা সাহিত্য, সংগীত, নাটক, মূকাভিনয়, নৃত্য, আবৃত্তি, গবেষণা বা শিল্পচর্চায় অনন্য অবদান রাখছেন—তাদের কাজ রাষ্ট্রের নথিতে স্থান পাবে না, এমন বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করে দেশে-বিদেশে উল্লেখযোগ্য অবদানকারীদের তালিকা হালনাগাদ করা সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, পদক প্রদানের ঘোষণায় সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্তের বদলে প্রামাণ্য মূল্যায়ন-রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত, যাতে জাতি জানতে পারে কেন একজনকে বেছে নেওয়া হলো। গোপনীয়তার আড়ালেই অনাস্থা জন্মায়; স্বচ্ছতাই আস্থার ভিত্তি।
রাষ্ট্রের সম্মাননা কোনো দয়া নয়—এটি জাতির ঋণস্বীকার। সেই ঋণ যদি আমলাতান্ত্রিক প্রহসনে পরিণত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল কয়েকজন শিল্পী নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ।
নতুন সরকারের কাছে দাবী
এখনই সময় দলীয় সংকীর্ণতা ও প্রশাসনিক জটিলতার বেড়াজাল ভেঙে সত্যিকার প্রতিভাকে মর্যাদা দেওয়ার।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক জিয়ার কাছে আবেদন- দেশাত্মবোধ হোক সবার আগে বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রের পদক রাষ্ট্রেরই মর্যাদা—এ কথা ভুলে গেলে চলবে না।
More Stories
৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত, থাকবে সরকারি ছুটি
সরকার ৬ জুলাই ‘পল্লী উন্নয়ন দিবস’ এবং ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬...
বাবার হাত থেকে ‘দাদু’র স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন জাইমা
বাবার হাত থেকে ‘দাদু’র স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন জাইম জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ দেশের...
সংস্কারের বকেয়া রেখেই নতুন বছরের হালখাতা খুলেছে সরকার: নাহিদ ইসলাম
পয়লা বৈশাখে হালখাতার বকেয়া পরিশোধের মতো জাতীয় জীবনের সব বকেয়া পরিশোধ করতে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের...
আবারও ফ্যাসিবাদ কায়েমের ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার: জামায়াত আমির
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার আবারও ফ্যাসিবাদ কায়েমের ইঙ্গিত দিচ্ছে,...
জামিনে মুক্ত সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এর আগে সকালে জুলাই আন্দোলনের...
পাঠকের কলাম: লস এঞ্জেলেসে কি আসলেই ফোবানা হচ্ছে?
(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নহে) লস এঞ্জেলেসে ৪০তম ফোবানা ২০২৬ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এই ফোবানার আয়োজক কমিটি প্রচার...
