Read Time:9 Minute, 56 Second

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তিকে ‘একটি গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তার দাবি, দুর্নীতি দমন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক যোগাযোগ—সব দিক থেকেই এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) রাত ৯টা ০৩ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন আশিক চৌধুরী।

পোস্টের শুরুতেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গ ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, ‘কয়েকদিন আগের কথা। বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নন্দিনী হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “আমার ভাগের ৩০০ কোটি টাকা কই?” জানতে পারলাম, জনৈক শ্রমিকনেতা বলেছেন, আমি নাকি ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছি। পরে অবশ্য ওই নেতা ভুল শুধরেছেন, আমি নাকি আসলে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পেয়েছি। জনৈকা ইউটিউবার সেই উত্তেজনায় আমাকে “ইকোনমিক হিটম্যান” বলে ট্যাগ দিয়ে দিলেন। বুঝলাম, উনি পারকিনসের বইয়ের এক পৃষ্ঠাও পড়েননি। ইকোনমিক হিটম্যান কাকে বলে, তাও জানেন না।’

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি ‘একটি গেম চেঞ্জার’: আশিক চৌধুরী
চট্টগ্রামের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর

তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর (এনসিটি) আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটা আমার জন্য একই সঙ্গে ন্যাশনাল এবং পার্সোনাল হয়ে গেল। এই প্রজেক্ট মাফিয়া স্টাইলের দুর্নীতি, তথাকথিত সুশীলদের অবাস্তব ধ্যানধারণা আর সিস্টেমের মিডিওক্রেসির বিরুদ্ধে একটা স্ট্যান্ড। আমাদের অ্যামবিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।’

বাংলাদেশের বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৫ সালের র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বন্দর সগৌরবে ৩৬৪তম। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দর ১১তম। রপ্তানিমুখী দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আমরা বারবার একই উদ্বেগের কথা শুনি—লিড টাইম বেশি হওয়ার কারণে অন্যান্য সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অর্ডার হারাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, কনটেইনার ডুয়েল টাইম মাত্র একদিন কমাতে পারলেই রপ্তানি বাড়তে পারে প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে বর্তমানে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বা “ইকুইপমেন্ট অ্যাভেইলেবিলিটি” মাত্র ৭০ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড ৯৩ শতাংশ। তাছাড়া গত কয়েক বছর গণমাধ্যমে এই বন্দর নিয়ে অহরহ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এনসিটির সমস্যা শুধু টাকার নয়, এটি দক্ষতা, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার সংকট।’

সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই কমপ্লেক্স প্রবলেমের সলিউশন খুব সিম্পল। আমাদের বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত, অভিজ্ঞ, আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরদের নিয়ে আসতে হবে, যারা আমাদের বন্দরগুলোকে বিশ্বমানের করে তুলতে পারবে। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে হাইয়েস্ট স্ট্যান্ডার্ড সার্ভিস দেবে। আর ধীরে ধীরে আমরা গড়ে তুলব নিজেদের সক্ষমতা।’

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘গত বছর আমরা লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তি করেছি ইউরোপের বিখ্যাত মার্সক গ্রুপের সঙ্গে। বে টার্মিনাল নিয়ে কথা চলছে পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে। আর আজকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেল ডিপি ওয়ার্ল্ড।’

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সক্ষমতার তুলনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ উদীয়মান অর্থনীতির অনেক দেশে সফলভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করছে। পার্থক্যটা কেমন? আমাদের বন্দরে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম গড়ে আড়াই দিন; ডিপি ওয়ার্ল্ডের গড় ২৪ ঘণ্টা। আমাদের ঘণ্টায় ক্রেন হ্যান্ডলিং ২২টি; আর ডিপি বিশ্বব্যাপী গড়ে ৩৫টিরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল করে। একটু ভাবুন।’

চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রায়ই শুনি, সব ভালো হলে এত গোপনীয়তা কেন? দেখুন, দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু পূর্ণ চুক্তি প্রকাশ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সম্পূর্ণ চুক্তির পরিবর্তে সারাংশ প্রকাশের সুপারিশ করে, যাতে স্বচ্ছতাও বজায় থাকে, আবার বেসরকারি অংশীদারের বৈধ গোপনীয়তাও রক্ষা পায়। চুক্তির সারাংশ কমেন্টে দিচ্ছি।’

চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকার প্রশংসা করে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের চৌকস কিছু কর্মকর্তা দিনরাত খেটে এই চুক্তি নেগোসিয়েট করেছেন। আমাদের এই জার্নি নিয়ে গল্প লেখা যাবে। দুর্নীতি দমন, এফিসিয়েন্সি, টেকনোলজি ট্রান্সফার, ইনভেস্টমেন্ট, গ্লোবাল কানেক্টিভিটি—সব দিক থেকে আমাদের দেশের জন্য এটি একটি গেম চেঞ্জার।’

উল্লেখ্য, শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। আজ বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের নির্ধারিত মেয়াদে টার্মিনালের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিটির জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।

তিনি জানান, চুক্তির শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি বা আপফ্রন্ট ফি এবং প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

নৌপরিবহনমন্ত্রী আরও জানান, চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনাল পরিচালনার রাজস্বের ভাগ ও নির্ধারিত বার্ষিক ফি পাবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের আয়ের ৬৭ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেবে। গড়ে প্রতি কনটেইনারে ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার আয় হলে বন্দরের অংশ পড়বে ৯৩ থেকে ১০৩ ডলার।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে
Next post আওয়ামী লীগ দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করেছিল: আখতার হোসেন
Close