Read Time:5 Minute, 50 Second

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভান্ডারের দেশ ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দুটি প্রশ্ন—তেলের দামে এর প্রভাব কী হবে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন (৩০ হাজার ৩০০) ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ইরাকের চেয়েও বেশি তেল রয়েছে দেশটিতে। এই বিপুল তেলভান্ডারই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব কতটা
সপ্তাহান্তে তেলের ফিউচার বাজার বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিক দামের প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম বড় ধরনের উল্লম্ফনের আশঙ্কা কম। কারণ, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ।

প্রাইস ফিউচারস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক সরকার তেলখাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য অনুকূল ছিল না। অবকাঠামোরও বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। ফলে হঠাৎ করে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ হলেও বিশ্ববাজারে বড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।

চলতি বছর অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাবের কারণে তেলের দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ওপেক উৎপাদন বাড়ালেও চাহিদা কিছুটা কমেছে। এর মধ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের ওপরে উঠলেও আবার প্রায় ৫৭ ডলারে নেমেছে।

ক্ষমতার শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা
মাদুরোর অপসারণের ফলে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নির্বাসিত নেতা এদমুন্দো গনজালেসকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও তাকে সমর্থন করেন।

ফিল ফ্লিনের মতে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী যদি বিরোধীদের সমর্থন দেয়, তাহলে বৈশ্বিক বাজার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইঙ্গিত মিললে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

তেল আছে, কিন্তু উৎপাদন কম
ভেনেজুয়েলার তেলভান্ডার বিশ্বের সবচেয়ে বড় হলেও উৎপাদন সক্ষমতা খুবই সীমিত। ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার আগে দেশটি দিনে ২০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল উৎপাদন করতো। সমাজতান্ত্রিক শাসন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উৎপাদন এখন অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।

ভেনেজুয়েলার তেল মূলত ভারী ও সালফারযুক্ত, যা উত্তোলন ও পরিশোধনের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সেই সক্ষমতা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশটিতে কাজ করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কতটা?
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে লাভজনক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রিফাইনারি ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই নির্মিত। এই তেল ডিজেল, অ্যাসফল্ট ও ভারী শিল্পে ব্যবহৃত জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ।

ফিল ফ্লিন বলেন, পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলো আবার ভেনেজুয়েলায় কাজের সুযোগ পায়, তাহলে তা বৈশ্বিক তেলবাজারের জন্য ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post মাদুরোর আগে আর কোন কোন সরকারপ্রধানকে বন্দি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র?
Next post গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন
Close