Read Time:30 Minute, 16 Second

শাহরিয়ার বাবু লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র:

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলার আগে আমি আমার অবস্থান পরিষ্কার করে নিতে চাই । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সন্তান। একটি নদী (মধুমতি) ভৌগোলিকভাবে আমাদের দুই ভুমিকে/গ‍্রামকে আলাদা করলেও, কাকতালীয়ভাবে বংগবন্ধুর বাড়ির পাশে পাটগাথী বিজ‍্র পার হলেই “চড় চিংগডী”আমার পৈতৃক গ্রামের বাড়ি । আমার দাদা মরহুম শেখ ময়েন উদ্দিন, বাবা মরহুম শেখ মোশারফ হোসেন এবং মা সৈয়দা সুফিয়া বেগম । বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন । উনারা ছেলেবেলা থেকেই এই গ্রামের মাটিতে বড় হয়েছে। আমার বাবা ছোটবেলায় ভাল ফুটবল খেলতেন । খেলা ও চাকরি সুবাদে উনি জীবদ্দশায় সবার সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল এবং যোগাযোগ রাখতেন। আসুন আমরা একটু দেখে নেই – টংগি পাড়া ও এর আসে-পাশের গ্রাম গুলোর শেখ পরিবার হয়ে উঠার বংশ পরিকাঠামো । শেখ পরিবারের ঐতিহ্য ও বংশপরম্পরা পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ আওয়াল আরব দেশ—কিংবা বর্তমান ইরাক অঞ্চলের—একজন ইসলাম প্রচারক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলায় আগমন করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কথিত আছে, তিনি সোনারগাঁও ও মেঘনা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরেরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এবং তাঁদের একটি শাখা দক্ষিণ বাংলার দিকে এসে বসতি স্থাপন করে। প্রচলিত পারিবারিক বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ আওয়ালের বংশধরদের মধ্যে শেখ জহির উদ্দিন সোনারগাঁও অঞ্চলে বসবাস করতেন। তাঁর পুত্র তেকড়ি শেখ ব্যবসায়িক কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার দিকে চলে আসেন বলে পারিবারিকভাবে বলা হয়ে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মে শেখ বোরহান উদ্দিন মধুমতী ও ঘাঘর নদীর মধ্যবর্তী টুঙ্গিপাড়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন বলে প্রচলিত রয়েছে। এরপর কয়েক প্রজন্ম ধরে এই পরিবার টুঙ্গিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় বসবাস করতে থাকে। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিকতা থেকেই গোপালগঞ্জের শেখ পরিবারের একটি শাখার বিকাশ ঘটে। প্রচলিত বংশপরম্পরায় পরবর্তী সময়ে শেখ লুৎফর রহমান এবং তাঁর পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের নামও এই ধারার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সহজভাবে প্রচলিত বংশধারাটি এভাবে উপস্থাপন করা যায়: শেখ আওয়াল ↓ শেখ জহির উদ্দিন ↓ তেকড়ি শেখ ↓ শেখ বোরহান উদ্দিন ↓ টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবার ↓ পরবর্তী প্রজন্মসমূহ ↓ শেখ লুৎফর রহমান ↓ শেখ মুজিবুর রহমান শেখ পরিবারের গুলোর বিশ্বাস ও পারিবারিক স্মৃতিতেও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে আমরা মনে করি। অর্থাৎ, আমাদের শেখ পরিবার গুলোও এই দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী বংশপরম্পরার একটি অংশ হতে পারে—এমন একটি পারিবারিক ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা জরুরি: এই বংশপরম্পরার প্রতিটি ধাপ সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিল দ্বারা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই এটিকে পারিবারিক ঐতিহ্য, বংশলতিকা ও প্রচলিত মৌখিক ইতিহাসের ভিত্তিতে সংরক্ষিত একটি বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করাই অধিকতর সতর্ক ও যথাযথ। ভবিষ্যতে পুরোনো দলিল, জমির খতিয়ান, পারিবারিক নথি, কবরের শিলালিপি বা অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র পাওয়া গেলে এই বংশপরম্পরার আরও নির্ভরযোগ্য যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। আমাদের কাছে এই ঐতিহ্যের মূল্য শুধু বংশপরিচয়ে নয়; বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, তাঁদের জীবনযাপন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণের মধ্যেও নিহিত। আমার নানা বাড়ি বিক্রমপুর জেলায় । ব‍্যবসায়িক কারনে তিনি ঢাকাতেই থাকতেন । আমার নানা মরহুম সৈয়দ মোফাজ্জল হোসেন ঢাকার বাসাবোতে তার বাড়ির পাশেই নিজস্ব জায়গাতে একটি মসজিদ নিমার্ণ করেছেন, মসজিদটির ওয়াকফ এস্টেট এর অধীনে বিগত ৪০ বছর আমার নানার পরিবারই দেখাশোনা করতেন । আমার আম্মার কাকা জীবিত কিংবদন্তি “কুদরত নানা” (এস পি মাহমুব ) । কুদরত নানা বংগবন্ধু খুবই বিশ্বাসী ঘনিষ্ঠ একজন ছিলেন । বংগবন্ধু নানাকে পুত্রের চোখে দেখতেন ও ভালবাসতেন । কুদরত নানার লেখা দুটি খন্ড বইতে বংগবন্ধুর জীবন-যাপন এবং তত কালীন দেশের প্রেক্ষাপট সহ অনেক ঘটনা ছবির মতন ফুটিয়ে তুলেছেন । আমি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি— দুই দলেরই শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সাথে কাছ থেকে মিশেছি এবং তাদের রাজনীতির সমগোত্রীয় সম্পর্কিত ছিলাম, তাদের কাজকর্ম দেখেছি এবং নানা দিক নিজের চোখে পর্যবেক্ষণ করেছি । সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি রাজনীতির ভেতরের ভালো-মন্দ, ওঠা-নামা, ভুল-সঠিক সবকিছুই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি । এসব দেখেশুনে আমার নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে—যেখানে আমি নীতিকে ব্যক্তিস্বার্থের উপরে এবং জনকল্যাণকে কেন্দ্রে রাখার পক্ষে অবস্থান নেবো । মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি সরকারের সাবেক পাটমন্ত্রী, মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ স্যারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, সহচর ও সহকারী হিসেবে আমি সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছি। তাঁর নির্দেশনা, পরামর্শ ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমি সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছি এবং তাঁর নেতৃত্বে তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। বিশেষ করে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মইনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চলছিল, তখন গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলার মতো সাহসী কণ্ঠ খুবই সীমিত ছিল। সেই কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে মরহুম হান্নান শাহ ছিলেন একজন অকুতোভয় ও সাহসী রাজনৈতিক নেতা, যিনি জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। সে সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেত্রী যখন কারাবন্দি ছিলেন, তখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে কথা বলা, নেতাকর্মীদের সাহস জোগানো এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া রাজনৈতিক কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মরহুম হান্নান শাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পাশে একজন সহযোদ্ধা ও সহকারী হিসেবে থেকে আমি সেই কঠিন সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ পাই। তৎকালীন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে আমাকে বিভিন্ন সময় মামলা, হয়রানি এবং র‍্যাবের হাতে আটকের মতো পরিস্থিতিরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবুও গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছি। বিভিন্ন থানা ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিকল্পনা, সমন্বয় ও বাস্তবায়নে আমি সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করেছি। সে সময় বিভিন্ন ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। প্রতিটি কর্মসূচিতে হান্নান শাহ স্যারের দৃষ্টিভঙ্গি, নির্দেশনা ও পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছি। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আমার কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং আমাকে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শুধু একজন সহকারী বা সহযোদ্ধা হিসেবেই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরামর্শ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও আমি প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর নেতৃত্বে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আজও আমার স্মৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ও গৌরবের সঙ্গে অম্লান হয়ে আছে। প্রবাসে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত ২০১৩ সালে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং বিশেষ করে আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করি। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তখন আমাকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। নিজের পরিবার, সন্তানদের নিরাপত্তা, তাদের ভবিষ্যৎ এবং একটি স্থিতিশীল জীবন নিশ্চিত করার চিন্তা থেকেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। জন্মভূমি, প্রিয় মানুষ, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র—সবকিছু পেছনে ফেলে নতুন এক অজানা জীবনের পথে যাত্রা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক। কিন্তু পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তখন সেই সিদ্ধান্তই আমার কাছে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়েছিল। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেটি ছিল আমার জীবনের একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সময়ের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। তবে দেশ, দেশের মানুষ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, তা কখনোই হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। মরহুম হান্নান শাহ স্যারের সঙ্গে কাটানো সেই কঠিন সময়, তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আমার জীবনের এক অমূল্য অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর পাশে থেকে কাজ করার সুযোগ পাওয়াকে আমি আজও আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও সৌভাগ্য হিসেবে মনে করি। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান, আর মতের ভিন্নতা থাকবেই—এটাই স্বাভাবিক। ভিন্ন মতকে সম্মান করা এবং সেই স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়াই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। আমার এ দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাজনীতির মূল চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে । । মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই তো সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, এখন একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি দেশের রাজনীতি গভীরভাবে দেখেছি ও উপলব্ধি করেছি। আমার অভিজ্ঞতায় আমাদের রাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রেই সহনশীলতার বদলে সংঘাত, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের চর্চাই বেশি দেখা যায়। ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করা, সহনশীলতা চর্চা করা এবং যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে মতবিনিময় করাই একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের ভিত্তি। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনীতি কখনোই বিদ্বেষ বা বিভাজনের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়—বরং জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই হওয়া উচিত রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য। বংগবন্ধু মতন একজন রাজনীতিবিদের “জীবন কাল”পর্যালোচনা করলে আমি দেখতে পাই – আমাদেরকে তিনি শিখিয়েছে যে, প্রকৃত নেতৃত্বের ভিত্তি হলো জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তির দাবিতে বারবার পাকিস্তান সরকারের হাতে কারাবন্দি হয়েছিলেন। তিনি মোটামুটি ৪,৬৭৫ দিন, মানে প্রায় চৌদ্দ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, যা মূলত তখনকার পাকিস্তান আমলে ছিল। এই দীর্ঘ কারাবাস তার রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ধরা হয়। সংহতি, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধ মানুষের বাস্তব জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই একজন আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠে । যেটা বংগবন্ধু মাঝে বাংলাদেশের মানুষ দেখতে পেয়েছিল । আমি বংগবন্ধু আত্ব জীবনী. পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন বই, তাঁর ভাষণ এবং রাজনৈতিক জীবনের প্রামাণ্য দলিল অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁকে জানার চেষ্টা করেছি। আমার উপলব্ধিতে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, সাহসী, দূরদর্শী এবং জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী এক অসাধারণ রাজনৈতিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সেবা। তাঁর জীবন ও আদর্শ আজও সততা, দায়িত্ববোধ এবং জনসেবার মূল্যবোধে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে কেন্দ্র করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগঠিত হয়। স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বৈধতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন, তিনি সেটাই বলতেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করতেন। তাঁর কথায় আর কাজে মিল ছিল, আর দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন। নিজের স্বার্থ নয়, দেশের স্বার্থকেই তিনি সবসময় অগ্রাধিকার দিতেন। যুদ্ধ পরবর্তী ভংগুর বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, আমি বাংলাদেশ বাঙালিদের জন্য ৩ বছর কিছুই করতে পারব না। আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে, আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসা রেখেছিলেন। সেই বিশ্বাসই ছিল তাঁর নেতৃত্বের বড় শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ একসাথে মিলেই দেশ গড়ে তুলতে পারবে, যদি তাদের উপর বিশ্বাস রাখা হয়। এই বিশ্বাস থেকেই স্বাধীনতার পর তিনি পুনর্গঠন কাজ, কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তবে, এত বিশ্বাস আর আশার মাঝেও কিছু বড় দুর্বলতা ছিল। যেমন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিরোধী মত সামলানোর ক্ষেত্রে কখনও কখনও কৌশলগত কঠোরতা বা সতর্কতার অভাব দেখা যেত। তবুও তাঁর আদর্শ—মানুষকে ভালো বাসা ও বিশ্বাস করা—বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো গভীর প্রভাব ফেলে রেখে গেছে । দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই বিশ্বাস সব সময় সবাই একরকম ছিল না। অনেক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীও পরে তাঁর সাথে দূরত্ব তৈরি করেছিল। ততকালীন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ আর বহুমুখী মতবিরোধ মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল। তবুও তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—দেশকে নিজের পরিবার ভাবা—আজও অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে; আর তার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো নিয়ে মানুষ এখনো ভাবে, আলোচনা করে, আর ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নিতে চায়। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালে তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কাল তুলনামূলকভাবে স্বল্প হলেও, এই সময়েই তিনি রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিমূল স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার। বঙ্গবন্ধু সরকারের অনুরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক প্রত্যাশা এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। সেই উপলব্ধির ভিত্তিতে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য একদল বিপদগামী উচ্চাভিলাষী বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে এবং দেশে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক বিভাজনের একটি দীর্ঘ সময়ের সূচনা করে। বঙ্গবন্ধুর সরকার এবং তাঁর সময়কার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসে বিভিন্ন মত ও বিতর্ক রয়েছে। তবে একাডেমিক ও গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে তথ্যনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের অবদানকে অস্বীকার করা ইতিহাসের সামগ্রিক সত্যকে অস্বীকার করার শামিল। আমার দৃষ্টিতে, ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বদের যথাযথ সম্মান জানানো ব্যক্তিগত মর্যাদাকে খর্ব করে না; বরং তা ইতিহাসের বাস্তবতাকে স্বীকার করার পরিচায়ক। বঙ্গবন্ধুর অবদান বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ভবিষ্যতেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে, মতভেদ থাকলেও। বর্তমান বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক মূল্যবোধের ইতিবাচক বিকাশ অত্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষা, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে । আর তা এ সময়ে ( ২০২৬ইং) এসে বেশী জরুরি গেয়ে পরেছে । আমি বাংলাদেশের একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেব মনে করছি আমাদের পরিবর্তন দরকার আর তা শুরু করতে হবে এখনই নইলে – ভুল বিকৃত ইতিহাস ও সংস্কৃতি আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংসের দার প‍্রান‍্তে নিয়ে যাবে । আমাদের প্রথমত, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে সততা, শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলে মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শৃঙ্খলা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা শেখাতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতি, অন্যায় সুবিধা ও অনৈতিক আচরণ থেকে বিরত থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। চতুর্থত, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইনের সমান প্রয়োগ এবং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো মানুষের মানসিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তন। শিক্ষা, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি যদি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবে একটি আরও ঐক্যবদ্ধ, দায়িত্বশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমার বিশ্বাস, এভাবেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রুপকার জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর কল্পিত উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আদর্শ বাস্তবায়নের পথে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। “ আজ ১৫ই আগস্ট । দেশের বতমান প্রেক্ষাপটে তাকে স্মরণ করার মধ‍্য দিয়ে নিজেদের নিলজ্জতার এবং পুরো পরিবারের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে এর জন‍্য দুংখ প‍্রকাশ করছি এবং অনুরোধ করছি বংগবন্ধুকে নিয়ে আর কাঁদা ছোঁড়াছু্ঁড়ি করা না হয়, ভবিষ্যতে বংগবন্ধু নিয়ে যেন কোন দলের পৈতৃক সম্পত্তি না বানানো হয়। উনাকে উনার মতন ইতিহাসের পাতায় ছেড়ে দেন-দেখবেন বংগবন্ধু বাংলাদেশী জনগনের হ্রদয়ে তার আপন মহিমায় ফিরে ফিরে আসবে । পরিশেষে বলতে চাই “এ তুফান ভারি- দিতে হবে পারি, নিতে হবে -তরী পাড়” সময়োপযোগী সংলাপ । নোংরা ও সস্তা রাজনীতি ভুলে আসুন আমরা সবাই মিল দেশটা(তরী) সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাই ।

উল্লেখ্য: উপরোক্ত বংগবন্ধুকে নিয়ে বক্তব্য সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক মূল্যায়ন।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post নরেন্দ্র মোদির কাছে বার্তা নিয়ে গেলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার
Close