Read Time:8 Minute, 1 Second

কাজী মশহুরুল হুদা

প্রবাসে একটি কনস্যুলেট কেবল প্রশাসনিক কার্যালয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং নাগরিক মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু লস এঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—আসলে ফ্যাসিবাদী কারা?

যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল এবং সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, নাকি যারা ক্ষমতার ছায়া পাওয়ার আগেই ভিন্নমতকে নির্বাসনে পাঠাতে উদগ্রীব?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা জরুরি।

আমি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। তবে আমার পরিবার জিয়াউর রহমানের সময় থেকে বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। একই সাথে স্বাধীনতার সময় থেকে আমি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে বিশ্বাস করি।
আমার কাছে একটি সত্য অখণ্ড—
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্থপতি।
তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না।
কিন্তু সেই বিশ্বাস আমাকে কখনো অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যে নিয়ে যায়নি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বহু কর্মকাণ্ডের সাথে আমি একমত ছিলাম না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন এক সময় জাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলাম—যা এখন মনে হয় রাজনৈতিক পথভ্রষ্টতা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

১৯৮৩ সালে দেশ ছাড়ার পর থেকে আমি কোনো দলের সাথে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত নই। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া থেকে কখনো বিরত থাকিনি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আমি ডেমোক্রেটিক পার্টির সাথে যুক্ত হই। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছি।
লস এঞ্জেলেসে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছি।
লিটল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেছি
একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছি
লস এঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনস্যুলেট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিলাম
বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার জন্য কখনো সেই সম্পর্ক ব্যবহার করিনি।

গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমি তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখেছি।
এমনকি কনস্যুলেটের ভেতরেও রাজনৈতিক প্রতীক ও সহিংসতার রাজনীতি নিয়ে কবিতা পড়েছি। তবুও তখনকার কনসাল জেনারেল থেকে সর্বশেষ সামিয়া আঞ্জুমানের সময় পর্যন্ত আমার কনস্যুলেটে অবাধ যাতায়াত ছিল।
কেউ আমার বাকস্বাধীনতা নিয়ে আপত্তি তোলেনি।

৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
নতুন কনসাল জেনারেল জাবেদ ইকবাল দায়িত্ব নেওয়ার পর অদৃশ্যভাবে কনস্যুলেটে আমার প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এর পেছনে যে বাস্তবতা কাজ করছে তা প্রবাসী সমাজের কাছে গোপন নয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিএনপির একটি অংশ কনস্যুলেটকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে নিয়েছে এবং স্বাধীন কণ্ঠগুলোকে অস্বস্তিকর মনে করছে।
অথচ বাস্তবতা হলো—
যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় বিএনপির কার্যক্রম মিডিয়ায় তেমনভাবে প্রচার পেত না, তখন আমিই পত্রিকা ও মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম তুলে ধরেছি।
যখন দলটি বিভক্ত ছিল, তখন ঐক্যের উদ্যোগও নিয়েছিলাম।
এমনকি লিটল বাংলাদেশ বিউটিফিকেশন প্রকল্পে বাংলাবাজারের ওপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি স্থাপনের ব্যবস্থাও আমার উদ্যোগে হয়েছিল।

সম্প্রতি বিএনপি সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে দ্বিচারিতামূলক অবস্থান নিলে আমি একটি স্ট্যাটাস লিখেছিলাম—
“শুরুতেই বিএনপি জাতির সাথে বেঈমানী করল।”

এই একটি বাক্যই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়াল।
বিএনপি প্রেসক্লাবের ইফতার অনুষ্ঠানে আমাকে বয়কট করার সিদ্ধান্তে যোগদানে বিরত হয়। এমনকি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে কনসাল জেনারেল পর্যন্ত সেই বয়কটে অংশ নেন।
আমাকে কনস্যুলেটের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপি অলিখিতভাবে আমাকে বর্জন করে।

এখানেই প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে।
ফ্যাসিবাদী কারা?
যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে সমালোচনাকে সহ্য করেছে?
নাকি যারা ক্ষমতার কাছাকাছি যেতেই ভিন্নমতকে নির্বাসনে পাঠাতে চায়?
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা।
আর ফ্যাসিবাদের প্রথম লক্ষণ হলো—সমালোচনাকে শত্রু মনে করা।
যদি একটি কনস্যুলেট কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বলয়ে পরিণত হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়—এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও বিপজ্জনক।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আমি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি—
বর্তমান কনসাল জেনারেলের মেয়াদকালে আমি ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপি এবং লস এঞ্জেলেস কনস্যুলেট—উভয়কেই বয়কট করছি।

কারণ আমার কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সুবিধা নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই বড়।
একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কলম।
সেই কলম যদি ক্ষমতার ভয়ে থেমে যায়, তাহলে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আর কোনো অর্থ থাকে না।
আমার কলম অতীতেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছে। ভবিষ্যতেও লিখবে। ইনশাল্লাহ।

কারণ সত্যের পাশে দাঁড়ানোই একজন লেখকের একমাত্র দায়িত্ব।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত পাঠানো নিয়ে যা বলল ভারত
Close