Read Time:7 Minute, 3 Second

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফেরার আগে টানা ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মাথায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তার অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

১. জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন। এছাড়া গত ১৫ বছরে হাজারো গুমের অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সামাজিক বিভাজন ও অবিশ্বাস দূর করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে ফিরে আসার পর থেকেই ঐক্যের বার্তা দিয়ে আসছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আমরা যদি এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, তবে সেখান থেকে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব।”

২. আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল “আইনের শাসন নিশ্চিত করা।” হাসিনা আমলে রাজনীতিকীকরণের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করাও তার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।

৩. অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর্মসংস্থান
২০০৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি ডলারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য ও বেকারত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে। যুব বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং শিল্প খাতে চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি—

ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা

ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ

প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন

এসব পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছেন তারেক রহমান।

৪. ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

হাসিনা সরকারের পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

টাইমকে তারেক বলেন, ভারতের সঙ্গে করা কিছু চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে, যা সংশোধন করা দরকার। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “সবার আগে থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থ।”

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য ও বাজার সম্প্রসারণও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হবে।

৫. ইসলামপন্থী রাজনীতির বাস্তবতা
নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে এই দলের সঙ্গে জোট করলেও এবার বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

তারেক রহমান বলেছেন, “এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয়; বরং দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব, যারা গণতন্ত্রে ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাস করে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে; যেন ৫ আগস্টের আগের সময়ে আমাদের ফিরতে না হয়।”

শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ
শেখ হাসিনাকে উৎখাতের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী নেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেন।

আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অধ্যায়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এখন নজর থাকবে—তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post ২৯৭ আসনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা, চট্টগ্রাম-২ ও ৪ স্থগিত
Next post ক্ষমতায় ফেরার পথে বিএনপি, তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ চারদিকেই
Close