প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আমরা কেউই চিরস্থায়ী নই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা প্রয়োজন। তারা যেন জানে এই দেশ কোথা থেকে আসলো, কীভাবে যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধ তো একটা না, সামনে আরও যুদ্ধ আসবে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকে।
রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা একথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম।
বৈঠকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান, বীর উত্তম, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান, মেজর (অব.) কাইয়ুম খান, সাদেক আহমেদ খান, বীর প্রতীক হাবিবুল আলম, বীর প্রতীক মেজর (অব.) ফজলুর রহমান।
এছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সদস্য বীর প্রতীক মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান, মেজর (অব.) সৈয়দ মিজানুর রহমান, মেজর (অব.) এ কে এম হাফিজুর রহমান, মনোয়ারুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর, সদস্য সৈয়দ আবুল বাশার, সিরাজুল হক, মো. মনসুর আলী সরকার, অনিল বরণ রায়, নুরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ হিল সাফী, জাহাঙ্গীর কবির, প্রকৌশলী জাকারিয়া আহমেদ বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে বের করা এবং ভুয়াদের চিহ্নিত করতে উদ্যোগ নেওয়া। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন। এ কারণে শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে অতীতে অনেকে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। এটা যেন আর ভবিষ্যতে না ঘটে সেই ব্যবস্থা আমাদের করে যেতে হবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যখন এটাতে সুযোগ দেখল তখন এটাকেই ব্যবহার করল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আর প্রতিষ্ঠান থাকল না; খেলার পুতুল হয়ে গেল। খেলার পুতুল থেকে এগুলোকে আবার প্রতিষ্ঠান করাই আমাদের চেষ্টা ছিল।’
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ইতিহাস লিখতে পারা, ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একটি পবিত্র কাজ। এটা করতে পারা অত্যন্ত গর্বের। আর কয়েক বছর পর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি আমাদের ধরে রাখতে হবে। এজন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেদিকে আমাদের এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেন আমাদের জাতির মধ্যে অবিনশ্বর থাকে।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, ‘বিগত সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলি আওড়িয়ে মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করেছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা এ নিয়ে মর্মাহত ছিলেন, কষ্টে ছিলেন। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সকলে মিলে জঞ্জালমুক্ত করতে চাইছি। মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং গণভোটের আয়োজন করায় প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার চিহ্ন থাকবে না। সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে জুলাই সনদ অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে জানান তারা।
গণভোটে “না” জয়ী হলে তা হবে দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে ব্যক্তিগত পরিসরে গণভোটে “হ্যাঁ” এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেয়ার কথাও জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা একেবারে নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে আছি। সংবিধান সংস্কারের একটি সুযোগ আমরা গণ-অভ্যুত্থান থেকে পেয়েছি। সকল রাজনৈতিক দল ঐকমত্য কমিশন কাজ করেছে। এখন সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের আয়োজন করছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংস্কার না হলে, পরিবর্তন না হলে ঘুরে ফিরে একই জায়গায় থেকে যাবো, আর বের হতে পারব না।’
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপনি আন্তর্জাতিকভাবে যে বলয় তৈরি করেছেন সেজন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা, একটা দেউলিয়া অর্থনীতিকে সবল করার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদের যুদ্ধ করার লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তিলাভ। কিন্তু এখন জনগণ একদিকে, মুক্তিযোদ্ধা একদিকে, স্বাধীনতা আরেকদিকে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অপ-রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের আইসোলেট করে ফেলা হয়েছে।’
বৈঠকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা আক্ষেপ করে জানান, ১৬ বছরে সম্মান এমনভাবে নষ্ট হয়েছে যে পরিচয় দিতে পারতাম না। মানুষ জিজ্ঞেস করত, “আসল না নকল?”
ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, ‘বাক স্বাধীনতা, ৫৭ বছরে যেটা পাইনি সেটা আপনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সবাই এখন কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে, নিজেদের নেতা- উপযুক্ত লোক খুঁজে নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকারে যারা এসেছেন মুক্তিযুদ্ধকে টুইস্ট করেছেন। আমরা মতবিনিময় করে সংজ্ঞা পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিলাম। আপনি সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছেন। আগামীতে কী হবে জানিনা। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধাদের ভুল বোঝার যে সুযোগ ছিল আপনার সরকার সেটা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে; সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে বয়সে যুদ্ধ করেছিলাম, চব্বিশে সেই বয়সের ছেলেরাই জুলাই-গণ-অভ্যুত্থান করেছে। আমাদের মতো এই তরুণরাও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছে, পুরানো বয়ান-সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এরা আমাদেরই উত্তরসূরি। অনেকেই একাত্তর-চব্বিশকে মুখোমুখি করতে চায়। তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে।’
বৈঠকে তিন সংগঠনের নেতারা তাঁদের কাজ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও অধ্যায়কে এই প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেয়াই এখন মূল উদ্দেশ্য।
তাঁরা জানান, একাত্তরে সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছিল কিন্তু এটা জনযুদ্ধও ছিল। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতি-স্মারক সংরক্ষণ ও গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল হয়েছে। ঘুরে ঘুরে কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পদগুলো যাচাই করা হচ্ছে, সবকিছু নোট নেয়া হচ্ছে, জটিলতা চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং কীভাবে এগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার হয় তা নিয়ে কাজ চলছে। পরবর্তীতে যারা আসবেন তাদের জন্য একটি ছক ও কর্মপন্থা রেখে যেতে চেষ্টা করবেন বলেও জানান তাঁরা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনাদের শক্ত থাকতে হবে, যেন অতীতের মতো কেউ এসে গণ্ডগোল করতে না পারে। যে সম্পদ আছে সেটা যেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে, মানুষ যেন শ্রদ্ধা করতে পারে, স্মরণ করতে পারে সেজন্য ব্যবহার করতে হবে। দেশের স্থায়ী মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করতে হবে। অর্থের দিক থেকে, সম্পদের দিক থেকে এই সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং এটা ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হবে, কাজের পরিধিও বাড়াতে হবে।’ তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কাজ হবে কিন্তু নাগরিক হিসেবেও কাজ করে যেতে হবে। আর কয়দিন পরেই আমি সরকারে থাকব না। এটা আমার জায়গা ছিল না কখনোই। আমি ঘটনাচক্রে জড়িত হয়ে গেছি। তবে আমি নাগরিক হিসেবে আমার কর্তব্য পালন করে যাব
More Stories
জাফর ইকবালসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা...
নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী চার মন্ত্রীসহ ৩৫ জন, জাতিসংঘে বক্তব্য দেবেন বাংলায়
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে চারজন মন্ত্রীসহ ৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে সোমবার রাতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন...
জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর)...
নভেম্বরে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লি-ঢাকার আলোচনা: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক পথে ফেরাতে বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা ও দিল্লি। সফরের...
বাবা-মায়ের পথ ধরে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রথমবারের...
আট দফা দাবি না মানলে এক দফার আন্দোলনে যাবো: শফিকুর রহমান
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার জুলাই আন্দোলনের সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে...
