বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ১২টি দেশের পুলিশ প্রধান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা বৃহৎ দেশগুলোর পুলিশ প্রধান ও বাহিনীও রয়েছে। তাই নিউ ইয়র্কে আসন্ন জাতিসংঘের চিফ অব পুলিশ সামিটে (ইউএনকপ) এসব দেশের পুলিশ প্রধান ও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। প্রশ্ন উঠেছে, এত দেশের পুলিশ প্রধান ছাড়া এই সম্মেলন কতটা সফল ও কার্যকর হবে? তাই নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত পুলিশ প্রধানদের সম্মেলনে অংশগ্রহণের অনুমতি পেতে পারেন। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে অনুমতি পেলেও প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্র এতে অংশ নাও নিতে পারে।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক ‘ওপেন স্যাংশনস’ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করে থাকে। নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষক এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের অন্তত এক ডজন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তাদের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায়। কিছু কিছু বাহিনী ও কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

যেসব দেশের পুলিশ প্রধানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, বেলারুশ, মিয়ানমার, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও সিরিয়া। জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে এই কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞার আওতায়, যা সংখ্যার তুলনায় কম হলেও বিভিন্ন কারণে এসব দেশের গুরুত্ব রয়েছে।

এসব দেশের মধ্যে কোনও কোনোটির পুরো বাহিনী আবার কোনও কোনও দেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দফতরের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় রয়েছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ প্রধান ওলেগ বারানভ। তার ওপর ২০১৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। তখন তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টর দফতরের প্রশাসনে চাকরি করতেন। তার বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশটির পুলিশ বাহিনী। এই মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ওয়াং জিয়াওহংয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাও। চীনের সামরিক, আধাসামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

মিয়ানমারের পুলিশ প্রধান বা ডিরেক্টর জেনারেল অব মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল জিন মিন হতেতের ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও তিনিসহ তার দেশের সেনাবাহিনী ও কর্মকর্তাদের ওপর কানাডা, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থারও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ। যেকোনও সংকটেই বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর পাশে দাঁড়ান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০২০ সালে বেলারুশের জাতীয় নির্বাচনের পর ব্যাপক জনবিক্ষোভ দমনে রাশিয়া পুলিশ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিল। গণতন্ত্র না থাকায় এবং বিরোধী দল ও মতের প্রতি দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। বেলারুশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এই মন্ত্রণালয়ের ওপর ১৯৭০ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় দেশটির পুলিশ কর্মকর্তারাও।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে ইরান। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইরানের পুলিশ প্রধান হোসেইন আশতারির ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পুলিশ প্রধানদের সামিটে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ ২১ বছর লড়াই করে ক্ষমতায় আসা আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের ওপরও রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি নিজেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন প্রাদেশিক পুলিশ প্রধানদের সঙ্গে তিনি সমন্বয় করে থাকেন। তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ভেনিজুয়েলার পুলিশ প্রধান এমজেন হুয়ান ফ্রান্সিসকো রোমেরো ফিগুয়েরোয়া। তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি নিউ ইয়র্কে সম্মেলনে যোগ দিতে পারবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত না।

কিউবা ৬০ বছর ধরে মার্কিনিদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে দেশটির পুলিশ প্রধান ক্যালেহাস ভালকারসেলের যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত।

উত্তর কোরিয়ার ওপর দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাই পুলিশ প্রধানদের সামিটে ওই দেশটির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণও অনিশ্চয়তায়।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ সিরিয়ার বিরুদ্ধেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাদের পুলিশ বাহিনী বা তাদের প্রতিনিধিও নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত পুলিশ প্রধানদের সম্মেলনে যেতে পারবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও দেশটিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের চিফ অব পুলিশ সামিটে (ইউএনকপ) অংশ নেওয়ার জন্য ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দলে পুলিশ প্রধান ড. বেনজীর আহমেদকে মনোনীত করা হয়েছে। ছয় সদস্যের মনোনীত এই প্রতিনিধি দলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব আবু হেনা মোস্তফা জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব মো. আসাদুজ্জামান, পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাসিম ওয়াজেদ ও এআইজি মোহাম্মদ মাসুদ আলমের নাম রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের আইজিপি ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সামিটে অংশ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে সরকার আশা করছে, তিনি সামিটে অংশ নিতে পারবেন। সেই নিশ্চয়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দফতর। র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ ছাড়াও বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. আনোয়ার লতিফ খান ও র‌্যাব-৭ সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

জাতিসংঘের এই পুলিশ সামিটে চুক্তি অনুযায়ী আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিসা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যক্তিদের ভিসা না দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে। সেই হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনও দেশের পুলিশ প্রধানকে ভিসা দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। তাই এ বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই ইভেন্টে পুলিশ প্রধানরা বিশ্বের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব একটি ভাষণ দেন। পুলিশ প্রধানদের একটি গেট টুগেদারের মতো হয়। সেখানে এটির গুরুত্ব রয়েছে। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণে হয়তো চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও যেতো না। এসব দেশ থাকলে ভালো হতো।

এই সম্মেলনের সফলতা ও ব্যর্থতা বলতে কিছু নেই উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি একবার অংশগ্রহণ করেছি, এখান থেকে কোনও সিদ্ধান্ত আসে না। তবে এটি প্রেস্টিজিয়াস একটি ইভেন্ট। তবে সবার অংশগ্রহণ থাকলে গুরুত্ব বাড়ে।’

Previous post কানাডার সাস্কাটুনে অনুষ্ঠিত হলো ফোকফেস্ট ২০২২
Next post আমিরাতে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত ‘আমার ক্লিনিক’
Close