যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার একটি তিনতলা ভবনের সন্ধান পাওয়ার পর করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত। আগামী ১৯ অক্টোবর এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা এই আদেশ দেন।

আদালতের দুদকের সরকারি সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ জুলফিকার এই তথ্য জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে তিনতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়ায় গত ৩১ মার্চ এসকে সিনহা ও তাঁর ভাই অনন্ত কুমার সিনহার বিরুদ্ধে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (গুলশান) আনোয়ার প্রধান। ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর মামলাটি করেন তিনি।

মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

জানা যায়, এস কে সিনহার ছোট ভাই অনন্ত কুমার সিনহা যুক্তরাষ্ট্রে দন্তচিকিৎসক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংক থেকে ৩০ বছরের জন্য এক লাখ ৮ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার ঋণ নিয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার ডলার দিয়ে একটি বাড়ি কেনেন। ২০১৮ সালের ১২ জুন দুই লাখ ৮০ হাজার ডলার নগদ জমা দিয়ে আরেকটি বাড়ি কেনেন।

অনুসন্ধানের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২০ জুন পর্যন্ত নিউজার্সির প্যাটারসনে অবস্থিত ভ্যালি ন্যাশনাল ব্যাংকে অনন্ত কুমার সিনহার অ্যাকাউন্টে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৫৮ ডলার জমা হয়। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৫ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ৬০ হাজার ১০ ডলার জমা হয়। এসব ডলার ইন্দোনেশিয়া ও কানাডার রয় গ্রুপের কাছ থেকে পাওয়া, যা প্রকৃতপক্ষে একটি বিক্রয় কোম্পানি।

অনন্ত কুমার সিনহা বড় ভাই সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে নিয়ে ভ্যালি ন্যাশনাল ব্যাংকে যান, তখন তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানান, আমেরিকার প্যাটারসন এলাকায় বাড়ি কেনার জন্য বন্ধুর কাছ থেকে তিনি ফান্ড পেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষেই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি থাকাকালে বিভিন্নভাবে অবৈধ অর্থ অর্জন করে তা হুন্ডিসহ বিভিন্ন কায়দায় যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে তাঁর ছোট ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করেন। তা দিয়ে ১৭৯ জ্যাপার স্ট্রিট, প্যাটারসন নিউ জার্সি ০৭৫২২-তে ২০১৮ সালের ১২ জুন দুই লাখ ৮০ হাজার ডলার খরচ করে একটি বাড়ি কেনেন। সুতরাং, বাড়িটি পরোক্ষভাবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহারই।

দুদকের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে ভোগ দখলে রেখে এবং অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান গোপন করে দুই লাখ ৮০ হাজার ডলার পাচার করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২), (৩) ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় দুদক তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে।

এরই মধ্যে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে চার বছর এবং সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে ঋণ জালিয়াতির মামলায় চার বছর এবং অর্থ পাচারের মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ১০ জুলাই ও ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ জন আসামির আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। বাকি দুজনকে খালাস দেওয়া হয়।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে দুদক। সাত কোটি ১৪ লাখ টাকার সম্পদ তিনি বেনামে অর্জন করেছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তবে, মামলায় রাজউকের কোনো কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়নি।