মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও ৯০ পয়সা কমেছে। বৃহস্পতিবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে এখন প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা। এর আগে সর্বশেষ সোমবার (৩০ মে) ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো হয় ১ টাকা ১০ পয়সা।

যদিও এদিন ব্যাংকগুলোর জন্য বেঁধে দেওয়া হয় ডলারের একক রেট। তবে চার দিনের মাথায় তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবশ্য ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে এখনও ৯২ থেকে ৯৩ টাকা নিচ্ছে। আর খোলাবাজারে এখন ডলার বিক্রি হচ্ছে ৯৬-৯৭ টাকায়। বিদেশে হুন্ডিতেও ৯২-৯৩ টাকা দরে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসা কমে গেছে।

গত রবিবার সব ব্যাংকে ডলারের এক রেট ৮৯ টাকা বেঁধে দেওয়ার পর প্রবাসী আয়ে ভাটা ও রফতানিকারকরা বিল নবায়ন না করার পর বৃহস্পতিবার (২ জুন) আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তারা নিজেরাই ডলারের দাম নির্ধারণ করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকগুলো বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং চাহিদা বিবেচনায় ডলারের দাম ঠিক করবে। আজ থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।’ টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য আজ ৯০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়বে।

টাকার বিপরীতে ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গত রবিবার দাম বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্ত-ব্যাংক লেনদেনে ডলারের রেট ছিল ৮৯ টাকা। আমদানি পর্যায়ে ৮৯ টাকা ১৫ পয়সা। আর প্রবাসী আয় আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য ডলারের দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ৮৯ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু এ দাম নির্ধারণের পর কমে যায় প্রবাসী আয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে বিশ্বজুড়ে চাহিদা বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশের মতো ডলারের বিপরীতে দর হারাচ্ছে টাকা।

মূলত, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ডলারের ওপর বাড়ছে চাপ। এই চাপ সামাল দিতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যদিকে ব্যাংকারদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদেরও বিদেশ ভ্রমণ বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ ডলার সাশ্রয়ী করতে নানামুখী তৎপরতার পরও যখন কাজ হচ্ছে না তখন বাধ্য হয়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমাতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ঠিক রাখতে গত মে মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত পাঁচ দফায় টাকার মান কমাতে হয়েছে। এর তিন দিন পর ২ জুন আবারও টাকার মান কমানো হলো। প্রথম দফায় দর বাড়ানো হয়েছিল ৯ মে। সেদিন ডলারের বিনিময় মূল্য ২৫ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে ছিল ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এক বছর আগে অর্থাৎ গত বছরের জুনে প্রতি ডলার আন্ত-ব্যাংকে বিক্রি হয়েছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা দরে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেছেন, ২৩ মে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৪০ পয়সা কমিয়ে আন্ত-ব্যাংক লেনদেনে নির্ধারণ করা হয় ৮৭ টাকা ৯০ পয়সা। ১৬ মে টাকার মান ৮০ পয়সা কমিয়ে ডলারের দাম ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ হয়। ১৫ মে এক ডলা‌রে খরচ হয় ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। ১০ মে ছিল ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা এবং ২৭ এপ্রিল ছিল ৮৬ টাকা ২০ পয়সা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাই থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্ত-ব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় স্থিতিশীল ছিল। এরপর আমদানি ব্যয় পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের সংকট শুরু হয়, যা এখনও অব্যাহত আছে।

২০২১ সালের আগস্টের শুরুতেও আন্ত-ব্যাংকে প্রতি ডলারের মূল্য একই ছিল। ওই বছরের ৩ আগস্ট থেকে বাড়তে বাড়তে গত বছরের ২২ আগস্ট প্রথমবারের মতো ডলারের দাম ৮৫ টাকা ছাড়ায়। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি বেড়ে ৮৬ টাকায় পৌঁছে। এরপর ২২ মার্চ পর্যন্ত এ দরেই স্থির ছিল। ২৩ মার্চ আরও ২০ পয়সা বেড়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়ায়। ২৭ এ‌প্রিল বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সায়। ১০ মে বাড়ে আরও ২৫ পয়সা। ৩০ মে এক ধাক্কায় বেড়ে যায় ১ টাকা ১০ পয়সা। সর্বশেষ ২ জুন বেড়ে যায় ৯০ পয়সা।

এদিকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৬ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও এর আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে গত অর্থবছরে ডলার কেনায় রেকর্ড গড়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

Previous post লস এঞ্জেলেসে মননশীল ও মনমুগ্ধকর স্বর্ণালী কবিতা সন্ধ্যা
Next post তুরস্কের নতুন নাম ‘তুর্কিয়ে’
Close