কোলাহলপূর্ণ বৈশ্বিক নগরীতে বসবাসের সুযোগ পেয়ে ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরে এসেছিলেন আতার স্যান্ডলার। এশিয়ার অন্যতম এই বাণিজ্যিক নগরী থেকে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সহজেই যাওয়া যায়।

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় দুই বছর ধরে মাস্ক পরে থাকা, ছোট ছোট দলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং ভ্রমণ বিধি-নিষেধে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে ইসরায়েলি মানবসম্পদ এই কর্মকর্তা চলতি মাসে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে নিউইয়র্কে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

স্যান্ডলার বলেন, ‘এটা অনেক দিন ধরেই চলছে এবং এখানে কিছু পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। জীবন এখানে অত্যন্ত, অত্যন্ত সহজ। (কিন্তু) পরিবার ও বন্ধুবান্ধবহীন, ভ্রমণের সুযোগ বিহীন এমন জীবনযাপনের কী মূল্য আছে?’

ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক সিঙ্গাপুর কোভিড-১৯ মহামারিকে সঙ্গী করে জীবনযাপনের পদ্ধতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পুঁজি ও প্রতিভার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি ধরে রাখতে অর্থনীতি ও সীমান্ত পুনরায় খুলে দেওয়ার সময় ঘনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপ রাষ্ট্রের মানুষকে করোনা থেকে রক্ষার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

জীবন-যাপনের উচ্চমান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানসম্মত কর্মস্থল, সহজ ভ্রমণ এবং কম কর হারের কারণে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে মনে করা হয় সিঙ্গাপুরকে। যে কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি এবং প্রবাসী পেশাজীবীরা ব্যবসা-বান্ধব এই দেশটির প্রতি আকৃষ্ট হন।

কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি দেশটিতে বসবাসরত অপেক্ষাকৃত অনেক সম্পদশালী প্রবাসীদের আত্ম-উপলব্ধিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। দেশটির মোট ৫৫ লাখ জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশই বিদেশি।

ADVERTISEMENT

কেউ কেউ নিজ দেশে ফিরে অধিকতর স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুবিধাকে সিঙ্গাপুরের বিধি-নিষেধের সঙ্গে তুলনা অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অবাধে ভ্রমণ করতে না পারার কথা বলছেন। তবে স্যান্ডলারের অভিজ্ঞতা আরও খারাপ। কারণ করোনা মহামারির মাঝের দিকে মেয়ের জন্ম দিয়েছেন তিনি। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা সেই সন্তানের সাথে গত এক বছর ধরে দেখা করতে পারেননি।

মহামারির সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নতুন নতুন বিনিয়োগ এবং দক্ষ মেধাবীদের অব্যাহতভাবে আকৃষ্ট করেছে সিঙ্গাপুর। কিন্তু মহামারিতে বিদেশিদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দেশটির জনসংখ্যা ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে বেশি কমেছে।

গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশটিতে বিদেশিদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ। আর সিঙ্গাপুর ছাড়ার এই হারে বেশি ভূমিকা রেখেছেন দেশটির নির্মাণ ও সামুদ্রিক পরিষেবার সাথে যুক্ত স্বল্প মজুরির প্রবাসী শ্রমিকরা।

এমনকি সিঙ্গাপুরে কাজের পাস রয়েছে এমন মানুষ অথবা মাসিক ৩ হাজার ৩৫০ ডলার উপার্জনকারী পেশাদারদের সংখ্যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ থেকে প্রায় ১৪ শতাংশ কমে গত বছরের জুনে এক লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ জনে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাস জীবন প্রকৃতিগতভাবেই অস্থায়ী। কারণ কোম্পানি ব্যয় এবং চাকরি কাটছাঁট করায় অনেক সময় প্রবাসীদের নিজ দেশে ফিরতে হয়। বিদেশি কর্মী চলে যাওয়ায় সীমান্ত বিধিনিষেধের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে বিদেশ থেকে কর্মীও আনতে পারে না।

কিন্তু এক দশক ধরে নগর রাষ্ট্রে কাজ করে আসা ফিলিপাইনের নাগরিক স্যান্তোস এবং তার ব্রিটিশ স্বামীকে করোনা মহামারি সিঙ্গাপুর থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছে। ছোট এই নগররাষ্ট্রে গ্রামীণ কোনো এলাকা নেই। যে কারণে সন্তানদের নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারা। বলেন, ‌‘আমরা এই ধরনের জীবনযাত্রা আর চাই না।’

২০১৯ সালে হংকং থেকে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন ক্রিস অ্যান্ডারসন। গত বছর হংকংয়ে ফেরার পর নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছেন তিনি। বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে বিদেশিদের ফেরার অনুমতি না থাকায় তিনি এখন বিকল্প চিন্তা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টার্টআপে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

অ্যান্ডারসন বলেন, ‘আপনি দেশটি ছাড়তে পারবেন। কিন্তু ফিরে আসার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন না… যা আপনার মনে সবসময় আঘাত করবে।’

Previous post নির্বাচন কমিশন গঠন আইন পাস
Next post ‘বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে প্রবাসীদের সাথে নিয়ে কাজ করবো’
Close