বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে একটি হট ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শঙ্কা আর উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। এমনকি দলের চেয়ারপারসনকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে তারা। পাশাপাশি এই ইস্যুতে কোনো রকম অরাজকতা সৃষ্টি যাতে না হয় তাই শক্ত অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে বর্তমানে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

বিএনপির চেয়ারপারসন এখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার চিকিৎসকরা বলছেন, ‘বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো না’। এদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছে। এমন আবেদন আগেও করা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকার ‘আইনানুযায়ী’ ব্যবস্থার বাইরে যাবে না।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে যে কারাগার থেকে বাসায় থেকে চিকিৎসা করতে দিয়েছি, এটাই কি বেশি নয়? আর কত চান, আমাকে বলেন। এখানে আমার কিছু করার নেই। আমার যতটুকু এখতিয়ার, আমি করেছি। এটা এখন আইনের ব্যাপার।’

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গুরুতর জানিয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেয়া জরুরি।

মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিয়মকালে তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাডাম অত্যন্ত গুরুতর অসুস্থ। অর্থাৎ যে কথা আমি বলেছিলাম প্রথম দিনে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই কথাটাই অ্যাপ্রোপ্রিয়েট। উনার অবস্থা স্টিল ক্রিটিক্যাল। এটা বলা যাবে না যে, উনি বিপদের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। স্টিল ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট।’

ফখরুল বলেন, ‘মোদ্দা কথা হচ্ছে, তাকে সময় নষ্ট না করে অতি দ্রুত বিদেশে অ্যাডভান্স সেন্টারে পাঠানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা চিকিৎসকদের কথা। সরকারের কাছে আমি আবেদন জানিয়েছিলাম যে, রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনাকে প্রাধান্য না দিয়ে জীবনকে বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য, একটা স্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করবার জন্য উনাকে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ করে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।’

৭৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি এবং ফুসফুসের সমস্যাসহ নানা জটিলতা ভুগছেন বলে জানিয়েছেন তার একজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক জাহিদ হোসেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘সিসিইউতে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) অবস্থা সংকটাপন্ন।’

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে জোটের পাঁচ নেতাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

বেগম জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার দাবিতে ঢাকা, জেলা ও মহানগরগুলোয় কর্মসূচি করছে বিএনপি।

সংসদে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়ার করা আবেদনটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী আগেই নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় তাকে বিদেশে যেতে অনুমতি দেয়ার আইনি কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের আইনের বইয়ে এটা নেই।

এদিকে, বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত কেউ কেউ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা দলীয় প্রধানের এই পরিণতির অন্যতম কারণ বলেও মনে করেন অনেকে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি বলেন, ‘বেগম জিয়ার অসুস্থতা আমাদের জন্য খুব হৃদয় বিদারক। নেতাকর্মীরা এখন তার অনুপস্থিতি বুঝতে পারে। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা আরও বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, নেতাকর্মীরা যখন যেভাবে পারছে দলীয় প্রধানের জন্য মাঠে থাকার চেষ্টা করছে।

এদিকে, দলীয় প্রধানের স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবন ফিরিয়ে দিতে নেতাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দলের ভেতরে।

এ ছাড়া বুধবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর নগর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে দেখতে গতকাল হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তিনি চরম ক্রান্তিকালে আছেন। মেডিক্যাল বোর্ডের ছয় জন চিকিৎসক আমাকে বিস্তারিত বলেছেন। আমি তাদের ফাইলের প্রত্যেকটা লেখা পড়ে দেখেছি। উনার মুখ দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে। আর রক্তচাপও অনেক নিচে নেমে গেছে।

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বলেন, সম্ভব হলে আজকে রাতেই ওনাকে বিদেশে ফ্লাই করা উচিত। যদি তাকে বিদেশে নেওয়া না হয় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। তার অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন।