রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) হওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য কীভাবে হবে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘সেটা মহামান্য রাষ্ট্রপতি করতে পারেন। যেমন গতবার রাষ্ট্রপতি সব দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। তবে সেটা রাষ্ট্রপতির বিষয়। কী করবেন সেটা ওই স্টেজের বিষয়, আমাদের করণীয় কিছু নেই।’

সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ইসি নিয়োগের রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে সিইসি আরও বলেন, ‘পরের ইসি গঠন করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। সেটা আমি সমর্থন করি। সমর্থনযোগ্য নির্বাচন কমিশন যেন হয়।’

এ সময় ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, ‘আইন প্রণয়নের বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদের বিষয়। এ নিয়ে ইসির মতামত দেওয়ার কিছু নেই। নির্বাচন কমিশনের কাছে এই বিষয়ে মতামত চাওয়া হয় না।’ যদি মতামত চাওয়া হয় তবে সেটি সেসময় ভাবা যাবে বলেও জানান তিনি।

বর্তমান পাঁচ সদস্যের ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। রাষ্ট্রপতি প্রধান দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে এই কমিশন নিয়োগ দিয়েছিলেন। সংবিধানের ‘আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে’ নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি উঠলেও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।

যদিও নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন যে, সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে ‘আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে’ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও গত ৫০ বছরে কোনো সরকারই এমন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে। উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করবেন।”

সেই ধরনের কোনো আইন হতে পারে কি না- জানতে চাইলে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘আইন তৈরি করে পার্লামেন্ট। এটা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়। তাদের কাছ থেকে এমন কোনো ইঙ্গিত আসেনি আইন করতে হবে, কি হবে না। তারা বলে যে, সাংবিধানিক যে ব্যবস্থা রয়েছে সে অনুযায়ী হবে।’

‘এটা আমরা টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় দেখি। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। আইন করার বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি’, যোগ করেন সিইসি।

‘৬০-৮০ ভাগ ভোট পড়ে, ইসি আস্থায়’

এ সময় নির্বাচন কমিশনের প্রধান দাবি করেন, বর্তমান ইসি আস্থা সংকটে নেই। তিনি বলেন, ‘ইসি মোটেই অনাস্থার জায়গা নয়। জনগণের আস্থা নেই একথা বলা যাবে না, জনগণ তো বলেনি আস্থা নেই।’

সিইসি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের লোকেরা যেটা বলেন, অনেক সময় তারা নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করে, তারা বলে জনগণের আস্থা নেই। যদি আস্থা না থাকে যেসব নির্বাচন হচ্ছে তাতে উপচেপড়া ভোটার থাকে কীভাবে, লাইন থাকে, ৬০-৮০ শতাংশ লোক ভোট দেয়। এটা আস্থার জায়গা।’

‘জনগণের আস্থা অবশ্যই আছে, জনগণ ঠিকই ভোট দিতে যায়’, জোর দিয়ে বলেন কে এম নূরুল হুদা।

‘রাশিয়ার মতো নির্বাচন এখানে সম্ভব না’

গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে মস্কোর সফরে যান বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের প্রধান। গত ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমা-এর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর সদস্য সংখ্যা ৪০০।

নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছে। যদিও অবৈধভাবে ব্যালটবাক্স ভর্তি করাসহ জোরপূর্বক ভোট দেওয়ার অনেক তথ্যও পাওয়া গেছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে। তবে দেশটির নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

১৪টি দল এই নির্বাচনে অংশ নিলেও পুতিন সরকারের সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচক বিরোধী নেতা অ্যালেক্সিই নাভালিনের দলকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তিনি এখন কারাগারে আছেন।

আজকের সংবাদ সম্মেলনে স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকরা সিইসির মস্কো সফরে অভিজ্ঞতা জানতে উদগ্রীব ছিলেন। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে জানতে চান, রাশিয়ার মতো নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব কি না? জবাবে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘আপাতত সম্ভব না। কত বছর লাগবে তাও তো জানি না।’

প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতার কারণে রাশিয়ায় ভোটে কোনো ঝামেলা থাকে না বলেও মন্তব্য করেন সিইসি। বাংলাদেশেও তো প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে- সাংবাদিকরা এমন কথা যোগ করলে, এর সূত্র ধরে নির্বাচন কমিশনের প্রধান বলেন, ‘এই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বেড়ে যাবে, তারপর ধীরে ধীরে আমার জটলা বা পেস্টার লাগানোর কাজগুলো কমে যাবে।’

বাংলাদেশে ভোট নিয়ে মানুষের আস্থার সংকটটা কোন জায়গায়- এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, ‘আস্থার জায়গা তো রাজনৈতিক ব্যাপার, এটা বলতে পারব না। তবে রাশিয়াতে তিন দিনব্যাপী ভোট হয়। আমাদের এখানে গ্রাম-গঞ্জে টিনের চালায় বা ক্যাম্পে ভোটের ব্যালট রাখতে হয়। এসব স্থানে তিন দিনব্যাপী ব্যালট রাখার মতো সক্ষমতা ইসি এখনো বৃদ্ধি করতে পারেনি। একইসঙ্গে এসব নিয়ে আমাদের ভোটাররাও যেন কেয়ার করে না।’

‘অথচ, রাশিয়াতে একই স্থানে একটা জিনিস তিন দিন ফেলে রাখলেও কিছুই হবে না। এটা হয়তো তাদের শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থার কারণে হয়েছে। এটা হতে আমাদের এখনো সময় লাগবে। তবে আমরা যত প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাব, তত আমাদের সুবিধা হবে। ভোট ভালো হবে’, যোগ করেন কে এম নূরুল হুদা।