তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন গুরুতর অসুস্থ। বিদেশে তাকে চিকিৎসা করাতে কয়েকবার সরকারের কাছে আবেদন করেছে তার পরিবার। দল থেকেও চেয়ারপারসনকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা করানোর দাবি উঠেছে। কিন্তু, আইনের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বিএনপি অভিযোগ করেছে, খালেদা জিয়াকে তার নাগরিক অধিকার থেকে সরকার বঞ্চিত করছে। তারপরও দলটি মনে করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করবে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি এ আশা ব্যক্ত করেছে।

গতকাল শনিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির একটি অনলাইন সভার সিদ্ধান্ত আজ রোববার জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানেই দলটির নেতাগণ এ আশা প্রকাশ করেন। সভায় জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসা প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রীর বক্তব্য ঔদ্বত্যপূর্ণ শালীনতা বিবর্জিত মন্তব্য করে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা।

সভা বিএনপির নেতারা বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মিথ্যা-ভিত্তিহীন মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে, সাংবিধানিক এবং প্রচলিত আইনের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনপ্রিয় এই নেত্রীকে তার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাকে তার প্রাপ্য জামিনও দেওয়া হয়নি। অথচ, একই ধরনের মামলায় প্রায় অভিযুক্তদের জামিন দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি আরও বলেছে, খুনের মামলা, সাজাপ্রাপ্ত ফাঁসি অথবা আজীবন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুক্তি নিয়ে বিদেশে গেছে। আর খালেদা জিয়া তার পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বাসভবনে সাময়িকভাবে স্থানান্তরের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রশাসনিক নির্দেশ। আইনের কোথাও বলা নেই সরকার তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দিতে পারবেন না। এটা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

গত শনিবার জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য অনভিপ্রেত এবং রাজনৈতিক শালীনতা বিবর্জিত বলে মনে করে বিএনপির এই সভা। সভায় বলা হয়েছে, সংসদ নেতা তার মন গড়া কল্প-কাহিনীর মধ্যে দিয়ে একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা, গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী এবং জনগণের আস্থাভাজন প্রিয় নেতাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন বলে করে বিএনপি। এই বক্তব্যেরও নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সভা মনে করে সংসদ নেতা ও আইনমন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্য খারাপ নজীর স্থাপন করছে। এই নেতিবাচক মনোভাব থেকে বেরিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসার সকল ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করবে বলে আশা করে বিএনপি।

সরকারের পদত্যাগ করা উচিত
সভায় করোনাভাইরাসের ভারতীয় ডেল্টা ভেরিয়েন্ট সংক্রমণ ও মৃত্যুহার ভায়াবহ বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ জন্য সরকারের উদাসীনতা, অযোগ্যতা ও দুর্নীতিকে দায়ি করা হয়। একদিকে চিকিৎসা ব্যাবস্থায় ব্যাপক নৈরাজ্য ও দুর্নীতি অন্যদিকে করোনা টিকার দুষ্প্রাপ্যতা কোটি কোটি মানুষের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই ব্যর্থতায় সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত বলে সভায় বলা হয়।

দরিদ্রদের জন্য এককালীন ১৫ হাজার
সভা মনে করে, গত বছরের মার্চ মাস হতে করোনার প্রাদুর্ভাবের ফলে সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউন, সাধারণ ছুটি, সীমিত লকডাউন, কঠোর লকডাউনের ফলে প্রায় ২ কোটির ওপরে মানুষ দরিদ্র হয়েছে। লাখ লাখ শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের ৮৫ শতাংশ, সংখ্যায় ৫ কোটিরও বেশি কর্মহীন। অবিলম্বে, এই সব নাগরিকদের এক কালীন ১৫ হাজার টাকা প্রদানের আহ্বান জানায় সভা।

মাববাধিকার পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ
সম্প্রতি আইন ও শালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত প্রতিবেদন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমাবনিতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রমুখ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। সভা মনে করে, ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, হত্যা, বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিক নির্যাতন এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহারে সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এই জবাবদিহীহীন অনির্বাচিত সরকারের একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সারা দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে তারই ফলশ্রুতি হচ্ছে এই ভয়াবহ মানবাধিকার পরিস্থিতি। এই ঘটনায় বিএনপি উদ্বেগ প্রকাশ করে যথাযথ ভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি।

সভায়, বন্যা দুর্গত অঞ্চলে অবিলম্বে সরকারি ত্রাণ বিতরণ এবং জীবতলা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন বীজ সরবরাহের দাবি জানায়। দলের নেতা-কর্মীদের যথা সম্ভব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সভায় মহাসচিব ছাড়াও অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।