ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠণে একমত হয়েছে দেশটির বিরোধীদলগুলো। সেই লক্ষ্যে প্রধান ৮টি বিরোধী দল জোট গঠণ করেছে। আর সেই দল বা নতুন সরকারের নেতা হতে যাচ্ছেন ইয়ামিনা দলের প্রধান নাফতালি বেনেত। এরপরই বিশ্বব্যাপী আলোচনায় তিনি। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, কে এই নাফতালি বেনেত?

জানা গেছে, ডানপন্থী ইহুদি ধর্মীয় দল ইয়ামিনার প্রধান নাফতালি বেনেত রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে প্রযুক্তি খাতে মিলনিয়ার ছিলেন। তারও আগে তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সহাকারী হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। আর এখন তাকেই সরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কট্টর সমর্থক এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধী হিসেবেও পরিচিত এই নেতা।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় তিনি বেশ বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। ২০১৩ সালে বেনেত বলেন, ‘ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসীদের মুক্তি নয়, বরং হত্যা করতে হবে’। ২০১৫ সালে বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠণ হবে আত্মহত্যার শামিল’।

নাফতালি বেনেতের পরিচয়

১৯৭২ সালের ২৫ মার্চ ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান শহর হাইফাতে জন্মগ্রহণ করেন নাফতালি বেনেত। এরপর ইহুদি অভিবাসী হয়ে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বাল্যকাল থেকেই তিনি কট্টর আধুনিক ইহুদি হিসেবে বেড়ে উঠেন। বর্তমানে তিনি ইসরায়েলের তেল আবিব শহরতলির রায়ানানা অঞ্চলে স্ত্রী ও চার সন্তানের সঙ্গে বসবাস করছেন।

সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীন ইসরায়েলের অভিজাত কমান্ডো ইউনিটের অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাফতালি বেনেত। ১৯৯৬ সালের দিকে দক্ষিণ লেবাননে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় কাফর কানা গ্রামে হামলা চালায় সে এবং তার বাহিনী। যখন গ্রামের মানুষরা পালিয়ে যাচ্ছিল তখন পেছন থেকে কামানের গোলা নিক্ষেপ করে ১০২ জনকে হত্যা করা হয়। যেটি ‘কানা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। এরপরই ওই অঞ্চলটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় তারা।

প্রযুক্তি খাতে সাফল্য

সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রযুক্তি শিল্পে কাজ শুরু করেন নাফতালি বেনেত। পাশাপাশি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি একটি সফটওয়ার কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সেটিকে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করেন। তার প্রতিষ্ঠানটি থেকে জালিয়াতি বিরোধী সফটওয়ার তৈরি করা হয়ে থাকে। ২০০৫ সালে মার্কিন সুরক্ষা সংস্থার কাছে ১৪৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কোম্পানিটি বিক্রি করে দেন তিনি।

রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন নাফতালি বেনেত। এরপর ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সিনিয়র সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি পদ ছাড়ার পর তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখল আন্দোলন ইয়েশা কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। অঞ্চলটি ১৯৬৭ সালেই দখলে নেয় ইহুদি রাষ্ট্রটি।

২০১৩ সালে ডানপন্থী ইহুদি হোম পার্টির নেতা হিসেবে তিনি আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পশ্চিম তীরে দখলের সমর্থক হিসেবে দলটিতে গড়ে তোলেন; যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ। পরবর্তীতে তিনি নেতানিয়াহু সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ইসরায়েলের রাজনীতির ডানপন্থী দল আইলেট শেকড এর সঙ্গে মিলিত হয়ে বেনেত গড়ে তোলেন নতুন একটি দল। কিন্তু ২০১৯ সালের নির্বাচনে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইলেকটোরালে পাশ করতে পারেনি তারা। যা দেশটিতে বিগত দুইবছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ নির্বাচনের প্রথমটি।

গত মার্চে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বেনেতের ইয়ামিনা দল মোট ১২০ আসনের মধ্যে ছয়টি আসন পেয়েছে। যা সংসদে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট। আর বিরোধী দলগুলোর জোট গঠনের ফলে এখন তিনি ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীও হতে যাচ্ছেন। একসময় যার (নেতানিয়াহু) সহকারী হিসেবে ছিলেন তাকেই সরিয়ে সরকার প্রধান হবেন তিনি।