ইতিহাস গড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। ৭৭ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট একদিকে যেমন সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইতিহাস গড়লেন তেমনি দেশটির নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পাওয়ারও রেকর্ড গড়লেন। ইতিহাস হয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদেও, প্রথমবারের মতো কোনো নারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সহকারী হলেন ভারতীয়-আমেরিকান কমলা হ্যারিস। গত মঙ্গলবার দেশটির ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণের পর চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষা কেবল দীর্ঘই হচ্ছিল। ভোটের রাতেই বাইডেনের জয়ের ইঙ্গিত মিললেও পদ্ধতিগত কারণে গণনায় বিলম্ব আর প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের মামলা চার দিন ধরে অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। বাইডেন এগিয়ে থাকলেও সম্ভাবনা ছিল বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও। জনমত জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো করে ভোটের আমেজে টানটান উত্তেজনা আনা ট্রাম্প টানা তিন দিন নিঃশ্বাস ফেলছিলেন বাইডেনের ঘাড়ে। তবে গতকাল শনিবার সব উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার অবসান ঘটায় ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য পেনসিলভানিয়ার ফল। বার্তা সংস্থা এপি, সিএনএন, ফক্স নিউজসহ যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো গতকাল রাতে জানায়, তাদের হিসাবে ট্রাম্পকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। অবসান হলো বহু আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনের।

এই নির্বাচনে হেরে ট্রাম্পও যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথম দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হওয়ার রেকর্ড গড়লেন। ১৯৯২ সালে দ্বিতীয়বার লড়াইয়ে নেমে হেরেছিলেন তারই দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বা সিনিয়র বুশ।

সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রজেকশনে এতদিন দুই প্রার্থীর ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা নিয়ে তথ্যের ভিন্নতা থাকলেও ২০ ইলেকটোরাল ভোটের রাজ্য পেনসিলভানিয়ার ফল গতকাল তার অবসান ঘটায়। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে সব সংবাদমাধ্যমই যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের বিজয় ঘোষণা করে।

এদিকে কাক্সিক্ষত ঘোষণার পরপরই ‘নতুন প্রেসিডেন্ট’ টুইট করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রবাসীকে। তিনি লিখেছেন, আমেরিকা, আমি গর্বিত যে- আমাদের মহান দেশকে নেতৃত্ব দিতে আমাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। বাইডেন বলেন, আমাদের সামনের কাজগুলো আরও কঠিন হবে। কিন্তু আমি কথা দিতে চাই, আমাকে যারা ভোট দিয়েছেন বা দেননি আমি সবারই প্রেসিডেন্ট হব। আমার প্রতি আপনাদের আস্থার সর্বোচ্চ মূল্য আমি দেব।

এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সব সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা, বর্ণবাদের উগ্রতা কমিয়ে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠন, অভিবাসন সংকট নিরসনসহ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা বাইডেনের প্রতিই আস্থা রেখেছেন আমেরিকানরা। অবশ্য ভোটের দিন এক্সিট পোল আসার পরে চিত্র অন্য রকম মনে হয়েছিল। তার সঙ্গে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ভোটগ্রহণের পর চার দিন ধরে চলা গণনা সেই সংশয় বাড়ায়। প্রথম দিকে ভোট গণনা শেষ হওয়া রাজ্যগুলোতে দুই প্রার্থীই প্রত্যাশা অনুযায়ী জয় পেয়ে যান। সে কারণে প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন সেই প্রশ্নের জবাব পেতে তাকিয়ে থাকতে হয় ব্যাটলগ্রাউন্ড হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি রাজ্যের ভোটের ফলের দিকে। এই কয়দিন পেনসিলভানিয়ার সঙ্গে জর্জিয়া, নেভাডা, নর্থ ক্যারোলাইনার ভোট গণনার দিকে নজর থাকে সারা বিশ্বের। এর মধ্যে প্রথম দিকে পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও আলাস্কায় ট্রাম্প এগিয়ে থাকলেও পোস্টাল ব্যালট গণনা শুরুর পর শুক্রবার পাল্টাতে থাকে চিত্র। পেনসিলভানিয়া ও জর্জিয়ায় ট্রাম্পকে টপকে এগিয়ে যান বাইডেন।

গতকাল এপির সর্বশেষ তথ্য বলছে, ওয়াশিংটন ডিসিসহ ৪৭ অঙ্গরাজ্যের ভোটই নির্ধারণ করেছে চূড়ান্ত ফল। তবে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরে আরও এক রাজ্য জিতেছেন বাইডেন। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য মতে, দেশজুড়ে বাইডেন পেয়েছেন ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৭২ হাজারের বেশি ভোট। আর ট্রাম্প পেয়েছেন ৭ কোটি ৬ লাখ ২ হাজারের বেশি। আর ইলেকটোরাল কলেজেও বাইডেন ২৯০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ট্রাম্প পেয়েছেন ২১৪ ভোট। উল্লেখ্য ইলেকটোরাল কলেজের আরও ৩৪ ভোট বাকি রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হতে হলে ৫৩৮ ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে দরকার হয় কমপক্ষে ২৭০ ভোট। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অবস্থা ছিলÑফল বাকি থাকা চার অঙ্গরাজ্যের সবগুলোতে জয় পেলে হোয়াইট হাউজ ছাড়তে হবে না ট্রাম্পকে।

এপির হিসাবে জো বাইডেন জয় পেয়েছেন পেনসিলভানিয়া, নাভাডা, ওয়াশিংটন, অরিগন, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো, ইলিনয়, ভার্জিনিয়া, নিউ জার্সি, ম্যারিল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক, ভারমন্ত, ম্যাসাচুসেটস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, কানেকটিকাট, রোড আইল্যান্ড, ডেলাওয়্যার, ডিস্টিক অব কলম্বিয়া, মেইন, মিশিগান, উইসকনসিন এবং অ্যারিজোনায়।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতেছেন আইডাহো, ওয়েমিং, ইউটাহ, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা, নেব্রাস্কা, ক্যানসাস, ওকলাহোমা, আরকানসাস, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, টেনেসি, কেন্টাকি, ইন্ডিয়ানা, আলাবামা, সাউথ ক্যারোলাইনা, মিসৌরি, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, মন্টানা, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ওহাইও, আইওয়া এবং লোয়াতে।

এখনো ফল বাকি আলাস্কা, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনার। এর মধ্যে জর্জিয়ায়ও জয় পেতে পারেন বাইডেন। সে হিসাবে তার মোট ইলেকটোরাল ভোট দাঁড়াবে ৩০৬ এ।

এদিকে বাইডেনের জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশ-বিদেশের নেতারা।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এক টুইটে বাইডেন ও কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য ‘সত্যিকারে মুখিয়ে আছেন’ তিনি।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও বাইডেন ও কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছেন। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের এই নেতাদের সঙ্গে আগামীতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি।

পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও কস্তা, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এরনা সোলবার্জ, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস, স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্ট্রুজেন, যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার, ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে টুইট করে বাইডেন ও হ্যারিসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও বারাক ওবামা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে ওবামা বলেছেন, আমার কাছে আমাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং আমাদের পরবর্তী ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেনকে অভিনন্দন জানানোর চেয়ে গর্বের কিছু আর হতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনকে দেখা হয়েছে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে। ১৮৬০ সালের গৃহযুদ্ধ এবং ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময়ের মতো এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন অনেকে।

আগামী জানুয়ারি মাসে তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাওয়া জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র (জো বাইডেন) ১৯৪২ সালের ২০ নভেম্বর পেনসিলভানিয়ার স্ক্রানটনে জন্ম গ্রহণ করেন। স্ক্রানটন, নিউ ক্যাসল কাউন্টি ও ডেলওয়্যারে তার বেড়ে ওঠা। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। তার বাবা জোসেফ রবিনেট বাইডেন সিনিয়র, মা ক্যাথরিন ইউজেনিয়া ফিনেগান। তার মা আইরিশ বংশোদ্ভূত।

বাইডেন ডেলওয়্যার ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে ডিগ্রি নেন। ১৯৭০ সালে ডেলওয়্যারের নিউ ক্যাসল কাউন্টির কাউন্সিলম্যান নির্বাচিত হন জো বাইডেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন জনপ্রিয় রিপাবলিকান সিনেটর স্যালেব বগসের বিপক্ষে ডেমোক্র্যাটিক দল থেকে প্রার্থী হন তিনি। তারপর নাম লেখান ইতিহাসে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী পঞ্চম সিনেটর নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে একবার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাইমারিতে লড়ার ঘোষণা দেন বাইডেন। তবে অসুস্থতার কারণে তাতে ক্ষান্ত দেন। ২০০৭ সালে আবার প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় প্রাইমারিতে নামেন। সেই যাত্রায় তিনি বারাক ওবামা আর হিলারি ক্লিনটনের বিপক্ষে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। পরে ২০০৮ সালে ওবামা তাকে রানিংমেট হিসেবে বেছে নেন। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রাইমারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস, ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ম্যাসাচুসেটসের এলিজাবেথ ওয়ারেন, পেটি বুটেগিগ, অ্যামি ক্লুবেচারকে পেছনে ফেলে দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন বাইডেন। আর এবার ট্রাম্পকে হারিয়ে জিতলেন হোয়াইট হাউজও।