বাংলাদেশিদের এগিয়ে যাওয়ার জোয়ার শুধু দেশে নয়, আটলান্টিকেও সেই ঢেউ আজ প্রবল। এখানে প্রবাসী বাঙালিরা সংখ্যায় যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জীবনযাত্রার মানও। বাংলাদেশি অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা না জানলেও এটুকু বলা যায় নিউইয়র্ক, টেক্সাস, মিশিগানের পাশাপাশি নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বৃহৎ অংশের বসবাস।

চাকরি, ব্যবসা, জীবন যাপন খরচ সবদিক থেকে সম্প্রতি বছরগুলোতে নিউজার্সিতে বাংলাদেশিদের আগমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েই চলেছে। সংখ্যা বিবেচনায় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে সর্বাধিক বাংলাদেশি আমেরিকানদের আবাসন। নতুন অভিবাসীদের প্রথম পছন্দ নিউইয়র্ক। কিন্তু বর্তমানে বাসা ভাড়া, বাড়ির উচ্চ মূল্য, জীবনযাপন খরচের কারণে নিম্ন আয়ের অভিবাসীদের প্রথম পছন্দ নিউজার্সি।

নিউজার্সির সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিদের অবস্থান রাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম শহর প্যাটারসনে। শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে যে কোনো জায়গায় দাঁড়ালে মনেই হবে না যে আপনি আমেরিকায় আছেন।

বাংলাদেশি মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলেছে মানুষের সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। প্যাটারসনের ইউনিয়ন অ্যাভিনিউ তেমনি একটি এগিয়ে যাওয়া জায়গার নাম। বাংলাদেশিদের চমৎকার একটি সমন্বয়ের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এই বাঙালি কমিউনিটি।

মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখানকার বাংলাদেশিরা আর পিছিয়ে নেই কোথাও। সব জায়গাতেই বিভিন্ন বিষয়ে যোগ্যতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছে লাল-সবুজের ওই মানুষগুলো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠনে বাংলাদেশের মানুষ আজ ভীষণভাবে তৎপর।

Newjarssi2

কঠোর পরিশ্রম, সততা আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার একাগ্রতার ওপরে ভর করে প্যাটারসনে গড়ে উঠেছে বাঙালি আবাসিক এলাকা। বাঙালিদের প্রাণচঞ্চলে মুখরিত হয়ে ওঠে ইউনিয়ন অ্যাভিনিউ। সেখানেই থেমে থাকেননি এখানকার মানুষ। প্যাটারসনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলম্যান বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত শাহীন খালিকের প্রচেষ্টায় ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে হয়েছে বাংলাদেশ বুলেভার্ড।

গত ১২ মার্চ বিকেলে প্যাটারসন সিটি হলের কাউন্সিল চেম্বারে কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট মার্টিজা ডেভিলার সভাপতিত্বে সিটি কাউন্সিলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্যাটারসনের সিটির ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলম্যান ও স্ট্রিট নেমিং কমিটির চেয়ারম্যান বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত শাহীন খালিক ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বুলেভার্ড করার প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়।

শহরটিতে কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিন, আরব জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশি অভিবাসীদের বসবাস। বাংলাদেশিদের একতার কারণে সিটি কাউন্সিলের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলম্যান, ডেপুটি মেয়রসহ বেশ কয়েকজন সিটি কমিশনার বাংলাদেশি আমেরিকান। একক প্রার্থিতা দিতে পারলে আগামী নির্বাচনে মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

শহরে দেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, মসজিদ, হাফেজি মাদরাসা, মন্দিরভিত্তিক ধর্মীয় সংস্থা, স্কুল, ড্রাইভিং স্কুল সব রয়েছে বাংলাদেশিদের তত্ত্বাবধানে। মার্কিন মু্ল্লুকে প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র স্থায়ী শহীদ মিনারটিও নিউজার্সির প্যাটারসনে। শহরের ওয়েস্ট সাইট পার্কে কেনেডি হাইস্কুলের পাশে নয়নাভিরাম সুদৃশ্য স্থানে উন্মুক্ত জায়গায় এটি দন্ডায়মান।

২০১৩ সালে সরকারিভাবে জমি আর দেড় লাখ ডলার বরাদ্দ পেয়েছিলেন বাংলাদেশিরা। পরে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবরে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশিরা ঘটা করে এই শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

প্যাটারসনের বাংলাদেশিরা প্রধানত চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী। তবে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এখানে পড়াশোনা শেষে ডাক্তার-প্রকৌশলী হিসাবে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করছেন। শহরে বুটিকের দোকানে বাংলাদেশি শাড়ি-জামা লুঙ্গি-গামছা পাওয়া যায়। ঈদ আর পূজায় প্রতিটি সন্ধ্যায় বাংলাদেশের আমেজে মেতে ওঠে এ শহর।

আর এই আমেজ দেখলে মনে হয় যেন প্রাণচঞ্চল একখণ্ড বাংলাদেশ। এই নিউজার্সির প্যাটারসনের বাংলাদেশিদের নিজস্ব ঘর বাড়ি এবং কতিপয় প্রতিষ্ঠানের ছবি দেখলেই খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে উজ্জ্বল আলোয় ভাসছেন বাংলাদেশিরা।