আহমেদ ফয়সাল :

যদিও ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মাইনরিটি শব্দটার উপরে চরম বিরক্ত! আমার জানামতে ন্যায় ও ইনসাফের ক্ষেত্রে আমার ধর্ম, মাইনরিটি মেজরিটির উপরে আলাদা কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আমি যেই সমাজে বড় হয়েছি, সেই সমাজে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, কিছু মুসলমান মাইনরিটি হিন্দুদেরকে ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করতো। আর যারা হিন্দুদের মালাউন বলতো, গালিগালাজ করতো, তারা শুধু নামেই মুসলমান ছিলো, কামে নয়।

আমার বাপ চাচাদের মুখে কোনদিনই মালাউন শব্দ শুনিনি। তবে বাপ চাচা ও অপরাপর মুরব্বিদের মুখে এও শুনেছি যে, জমিদারি যুগে হিন্দুরা মুসলমানদের অনেক অত্যাচার করত, ‘ম্লেচ্ছ’ সম্বোধন করত, বিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রদের উপরে বেশ বৈষম্য কোনো মুসলমান ছেলেপেলে হঠাৎ করে বা ভুল করে হিন্দুর ঘরে উঠলে রাম রাম বলে জল ঢেলে দিত। বলতে গেলে এই সেদিন আমার এক চাচা শ্বশুরের মুখেও শুনেছি, কুশংগল ইউনিয়নের(নলছিটি) গুপ্ত বাড়ি, সেনের বাড়ি, ভট্টাচার্য বাড়ি ও সিদ্ধকাঠী বাবুর বাড়িতে(জমিদার বাড়ি) এতদাঞ্চলের মধ্যে আমার পরদাদা আসাদ আলী সরদার ও সরমহলের গওহর উদ্দীন কন্ট্রাক্টর ছাড়া কোনো মুসলমান চটি পায়ে দিয়ে যেতে পারতোনা। সেনের বাড়ি গুপ্তবাড়ির পিচ্ছি ছেলেপানও অধিকাংশ বয়স্ক মুসলমানদের নাম ধরে ডাকতো। এই নিয়ে একবার তুলকালাম কান্ড ঘটেছিলো, সময় পেলে সে আরকদিন লিখবো।

৪৭’এর ভারত পাকিস্তান পার্টিশনের সময়ে তিনটা রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিলো। হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে ভারত, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পাকিস্তান & শিক ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এলাকা পাঞ্জাবে ‘খালিস্তান’; যদিও পাঞ্জাবে শিক ও মুসলিম ছিলো প্রায় সমানে সমান। শুধুমাত্র লুধিয়ানা জেলাতেই শিখেরা মেজরিটি ছিলো।

খালিস্তান প্রতিষ্ঠা নিয়ে ১লা আগষ্টেও(১৯৪৭) মুসলমানদের সাথে শরিকদের কোনো দ্বন্দ্ব ছিলোনা।
১লা আগষ্টে ভারতীয় নেতাদের সাথে ভাউন্ডারি কমিশনের সাথে বৈঠকের পরে ভারতীয় নেতারা বৈঠক করলেন শিক নেতা রনজিৎ শিং’দের সাথে।এরপরই ২রা আগস্ট থেকে পাঞ্জাবের দৃশ্যপট পালটে যেতে শুরু করে। শিখেরা খালিস্তানের দাবী থেকে খামোশ হয়ে যায়। ১২ই আগস্ট থেকে মুসলমানদের সাথে শিকদের রায়ট শুরু হয়ে যায়। পাঞ্জাবে মুসলিম নিধনের সেই জেনোসাইড ১৫ই আগস্টের সেপারেশনের পরেও তিনদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।
আন্ডার দ্যা টেবিলে কথা ছিলো, মুসলমানদের ভাগিয়ে শিখদের একক মেজরিটি করে ‘খালিস্তান’ কায়েম করে দেয়া হবে। কিন্তু শিখেরা যে প্রতারিত হচ্ছেন, সেই ভুল যখন ভাঙ্গে, ততক্ষণে বড্ড দেড়ি হয়ে গেছে!

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, গুরুদাশপুর, মেদিনীপুর, শান্তিপুর, নদীয়া প্রমুখ মুসলিম অধ্যুষিত এক বড় অঞ্চল বাউন্ডারি কমিশনের প্রথম ফয়সালায় পূর্বপাকিস্তানের ভাগে পরেছিলো। ১৪ই আগস্ট থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ঐ অঞ্চল পাকিস্তানী পতাকা ও সৈনিক নিয়োজিত ছিলো। ২২ আগস্ট এক ইংরেজের মুখ থেকে দিল্লীতে ঘোষণা করানো হলো, মালদহ, মেদিনীপুর, গুরুদাশপুর, পশ্চিম রাজশাহী, পশ্চিম বগুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভারতের অধিনে ন্যস্ত করা হয়েছে। অতঃপর সেখানে শুরু হয় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা! যারা কোনোমতে জান বাঁচাতে পেরেছে, তারা ছুটে আসে বর্ডারের পূর্ব পারে, পূর্বপাকিস্তানে।

এদিকে পূর্বপাকিস্তানের নোয়াখালী, লক্ষ্মিপুর,
ও সিলেটেও দাঙ্গা শুরু হলে জান বাঁচিয়ে হিন্দুরা চলে যায় ভারতে। এভাবেই ৪৭’এর সেপারেশনের সময় যেমন অনেক হিন্দুরা পূর্ববাংলা/পূর্বপাকিস্তান ত্যাগ করে, ঠিক তেমনি অসংখ্য মুসলমান তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলো। ঐসকল দাঙ্গার পেছনে যে শুধু সেপারেশন ও ধর্মই মূল ফ্যাক্টর ছিলো, তা নয়।
অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িঘর সহায় সম্পত্তি দখল’ও দাঙ্গার পেছনে মূখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করেছে।

সেই থেকে থেকে থেকে ইন্ডিয়াতে যত দাঙ্গা হয়েছে, তার প্রভাব পূর্ববাংলাতেও পরেছে। সম্পত্তি দখলের জন্যই সমাজের একটি অসাধু চক্রের জন্য প্রতিটা দাঙ্গার পরেই সংখলঘুরা এপার ওপার পারি জমায়।

তবে আমার চল্লিশোর্ধ্ব জীবদ্দশায় আমি কখনো দাঙ্গা দেখিনি। কিন্তু দাঙ্গা ছাড়াই কিছু পরিবারকে ওপারে চলে যেতে দেখেছি ও শুনেছি। আমার বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে মাইনরিটিদের মাঝে। আমি তাদের অপরাপর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মতই ভালোবাসি। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে মুসলিম ও মাইনরিটি বন্ধুদের মাঝে দৃষ্টির কোনো পার্থক্য করিনি।

সেই ছেলেবেলা থেকেই শুনে আসছি, দেশে মুসলিম পপুলেশন ৯০%। তার মানে মাইনরিটি পপুলেশন ১০%। ২০১৬ সেন্সাস অনুসারেও বাংলাদেশে মাইনরিটি পপুলেশন ১০%। তাহলে জনৈক মাইনরিটি নেত্রী প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিকটে যে নালিশ জানালো, 37 million(!?) মাইনরিটি পপুলেশন ডিজেপিয়ার্ড(উধাও, গুম বা অদৃশ্য হয়ে গেছে)! স্টিল 18 মিলিয়ন মাইনরিটি পিপলস সার্ভাইবিং!
১৬৩ মিলিয়নের মাঝে ১০% মাইনরিটি পপুলেশন হলে ৩৭+১৮= ৫৫! মানে সারে পাঁচ কোটি হয় কিকরে?

একবার চিন্তা করুন তো, তথ্যগুলি কতবড় ভয়ংকর ও দেশদ্রোহিতা? এরা কি আসলেই মাইনরিটি পপুলেশনের কল্যাণ চাচ্ছে? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? দেশে প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই তো এখন মাইনরিটি কর্তারা দাপটের সাথে দাবরে বেড়াচ্ছেন। রাষ্ট্রক্ষমতায়’ও তো বোধকরি মাইনরিটি বান্ধবরাই আছেন।
তথাপি মাইনরিটির এই স্বর্ণযুগেও দেশ নিয়ে কেন এই ভয়ংকর অপপ্রচার? যে দেশে ১০% মাইনরিটি পপুলেশন, সেই দেশের ইউএনও, ওসি, ডিসি, এসপি, ও বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ে আজ এভারেজ ২০% মাইনোরিটির দখলে। এমনকি মাদ্রাসা বোর্ডেও মাইনরিটি নিয়োগ পেয়েছেন!

এ এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। ১০% মাইনরিটি নেতারা, পীজুষ বন্দ্যোপাধ্যায়’রা যখন ৯০% মানুষের তাহজিব তামুদ্দুন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেটাও আমরা গুরুত্বের সাথে নিতে পারিনি। এই ষড়যন্ত্র কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভাবলে ভুল হবে। এটা দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে উসকানি। সাপের লেজ নিয়ে খেলা করতে নেই। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্যই, পানি ঘোলা হওয়ার আগেই এই ষড়যন্ত্রের জরুরী তদন্ত হওয়া ও ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।