কাজী মশহুরুল হুদা :

প্রবাসী বাংলাদেশী আমেরিকান কমিউনিটিতে সর্বত্র দেখবেন প্রচুর সংগঠন রয়েছে। নতুন নতুন সংগঠন তৈরি হচ্ছে। কোন সংগঠনই জনগনের নির্বাচনে হয় না। ঘরে বসে পকেট কমিটি তৈরি হয়। কোন কোন সংগঠনে নির্বাচন হয় শুধু মাত্র সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত। এই সকল সংগঠন কমিউনিটির মানুষের জন্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানাদি আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখন আমরা নিজেদের গণ্ডির বাইরে যেতে পারিনি। থাকি হোমল্যান্ডে কিন্তু মূলধারার সঙ্গে আমাদের কোন সেতুবন্ধন রচনা হচ্ছে না। প্রবাসে বর্তমানে তিনটি প্রজন্ম রয়েছে। প্রথম প্রজন্ম যারা দেশে থেকে এদেশে এসে বসবাস করছি। দ্বিতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাদেরই সন্তানরা এবং তৃতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- সন্তানদের সন্তানরা। লস এঞ্জেলেসের বাংলাদেশী প্রবাসী কমিউনিটির এই সকল সংগঠনের নেতৃত্ব কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রথম প্রজন্মের দখলে রয়েছে। তারা পদ-পদবী ও কমিউনিটির মানুষদের আনন্দদায়ক কিছু অনুষ্ঠান উপহার দিচ্ছেন। এই প্রথম প্রজন্ম শেষ হলে দেশ ও জাতির কৃষ্টি তুলে ধরার জন্য কোন পাইপ লাইন নেই বা তৈরি হচ্ছে না। কারণ আমরা পরবর্তী অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্ম বা তৃতীয় প্রজন্মদের কৃষ্টির পাইপে সংযোগ করতে পারিনি। আর না পারলে সংস্কৃতির ধারা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রথম প্রজন্মের তৃপ্তি না মেটা পর্যন্ত আমরা ক্ষমতা দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে দিতে বা দেখতে চাই না। আর তাই এখন পর্যন্ত এটা দেখাও যাচ্ছে না। দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতির চাবি তুলে না দিলে তারা এই সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে না, পাইপ লাইনে নিজের সম্পৃক্ত করতে পারবে না। এক সময় এই দেশে আমাদের সংস্কৃতির প্রবাহ থেমে যাবে। দীর্ঘ ৫০ বছর পর আমাদের ভাবতে হবে কিভাবে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির চাবিটা তুলে দিতে পারি এবং আমেরিকায় বাংলাদেশের মশাল তাদের মাধ্যমে জ্বালিয়ে আলোকিত করতে পারি।

এ কথা সত্য যে, কখনওই পরবর্তী প্রজন্মকে প্রথম প্রজন্মের তরিকায় ভেড়ানো যাবে না। তাদেরকে সময়ের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে হবে। তার প্রথম পদক্ষেপ হল মূলধারার সাথে কমিউনিটির সংযোগ স্থাপন। এই পথ ও পদ্ধতি সৃষ্টি করতে হবে এবং সেই বন্ধনের লাগাম নতুন বা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে অর্পণ করতে হবে। তাহলে দেখা যাবে তারাই দেশ ও দেশের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে প্রতিনিধিত্ব করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারেরও ভূমিকা থাকা জরুরী। দেশের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে প্রবাসে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এর প্রসার ও প্রচারে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে তারা এ বিষয়ে সচেতন হয়।

সম্প্রতি আমি বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশ ও বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌছে দেওয়ার কিছু প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। সারা বিশ্বে দ্যা আমেরিকান সেন্টার রয়েছে, বৃষ্টিশ কাউন্সিল রয়েছে, আঁলিয়াস ফ্রসেজ রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সারা বিশ্বে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাচ্ছে। তেমন ভাবে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সেন্টার খুলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাষা ও সংস্কৃতির তুলে ধরতে পারি। আমাদের সংস্কৃতিকে পারফরমেন্স আর্টের প্রসার নতুন প্রজন্ম তথা অন্যান্য ভাষাভাষি মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারি।

প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাবনায় বলেছি- আমেরিকার হাইস্কুল এবং কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ নিতে হয়, সেখানে বাংলাদেশ সেন্টার যদি থাকে তাহলে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্ম ও অন্য ভাষাভাষি আগ্রহীরা এটি শিখতে পারবে, জানতে পারবে।

বাংলার কৃষ্টির ব্রাণ্ড, ব্রেড ও ব্রীজ নির্মিত হবে এই উদ্যোগের ফলে। বৈদেশিক বাণিজ্যিক পথ উন্মুক্ত হবে। সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত থাকবে। বিস্তৃত হবে পাইপ লাইন। এসব বিষয় নিয়ে আমাদেরকে এখনই ভাবতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

আসুন চেষ্টা করে দেখি।