জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর আলোকে আগামী বছর কানাডার টরন্টোতে ‘চতুর্দশতম বইমেলা’ আয়োজনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হলো ১৩তম টরন্টো বাংলা বইমেলা। টরোন্টোর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অন্যমেলা’র আয়োজনে গত শনিবার টরন্টোর বাঙালি পাড়া নামে খ্যাত ড্যানফোর্থ এভিনিউতে শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে দুদিনব্যাপী টরন্টো বাংলা বইমেলা শুরু হয়। 

বইমেলার অনুষ্ঠান মূলমঞ্চে সাঈদা বারী, মেহরাব রহমান, অরুণা হায়দার ও জসিম মল্লিকের সঞ্চালনায় পরিবেশিত হয়।  কানাডা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকরা মেলার বিভিন্ন পর্বে আলোচনা, আবৃত্তি এবং নিজ নিজ গল্প নিয়ে কথা বলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেয়া, বিশেষ করে প্রবাসের প্রজন্মে বিস্তৃত করতে ইংরেজিতে অনুবাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এ সময় উল্লেখ করা হয় যে, বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদের ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকার স্টাইল ব্যবহার করতে হবে। শাব্দিক অনুবাদে প্রবাস প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেন কয়েকজন। 

মেলায় বসেছিল বইয়ের স্টল। কেনাকাটা হয়েছে ভালোই। অর্থাৎ মেলার বয়স যত বাড়ছে বাংলা বইয়ের প্রতি প্রবাসীদের আকর্ষণও বেড়েছে। 

মূলমঞ্চে প্রদর্শিত হয় ডকুমেন্টারি ‘বর্ণে বর্ণে বাঙালি’। এটির প্রদর্শন শেষে শুরু হয় উত্তর আমেরিকার কবিদের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি পর্ব। সভাপতিত্ব করেন বইমেলার প্রধান অতিথি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, দিলারা হাফিজ, ফেরদৌস নাহার ও কবি হাসানাত আব্দুল্লাহ। এ পর্বের সঞ্চালনা করেন সেলিম এইচ চৌধুরী। 
এরপর দিলারা নাহার বাবু ও চয়ন দাসের সঞ্চালনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে নীলাদ্রি নির্ঝরণী কলতান, নিশীথ জোনাকি প্রশান্তি, এবং এম আলিমুজ্জামানের সঞ্চালনায় অলম্পিয়া স্কুল অব মিউজিক এর শিল্পীবৃন্দ। 

মেলার অতিথিগণের অংশগ্রহনে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সচিব ড. আবুহেনা মোস্তফা কামাল, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি আসাদ চৌধুরী, কানাডার এমপি ডলি বেগম, দিলারা হাফিজ, জয়দেব সরকার, শহীদ খন্দকার। সভাপতিত্ব করেন বইমেলার আহবায়ক সাদি আহমেদ।

এরপর মূলমঞ্চে আবারো অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি পর্ব। এই পর্বে অংশ গ্রহণ করেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি ফেরদৌস নাহার, লালন নূর, ও রিপা নূর। 

স্থানীয় লেখক জসিম মল্লিকের সঞ্চালনায় সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কবি হাসানাত আব্দুল্লাহ, শেলী জামান খান, অরপি আহমেদ, ও হুমায়ুন কবির ঢালী। সভাপতিত্ব করেন কবি আসাদ চৌধুরী। আমন্ত্রিত শিল্পী রনি প্রেস্টিস রয়ের সংগীত পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে বইমেলার প্রথমদিনের সমাপ্তি ঘটে। 

কবিগুরুর উপর নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথ’ এবং ছোটদের ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’র মধ্য দিয়ে শুরু হয় শেষদিনের অনুষ্ঠান। 

এদিন আশরাফ আলীর সঞ্চালনায় ‘প্রবাসে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জসিম মল্লিক, সুজা রাশিদ, শেখ শাহনেওয়াজ, সোনিয়া হক, বাবুল চৌধুরী। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার গণমাধ্যমে প্রবাসীরা বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে উপস্থাপনের পাশাপাশি দেশের ও প্রবাসের চলমান ঘটনাবলিও উপস্থাপন করছেন। আর এভাবেই কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন গণমাধ্যম কর্মীরা-এমন অভিমত পোষণ করা হয়। 

এরপর মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক পর্বে অংশগ্রহণ করে নৃত্যকলা কেন্দ্র, ও শফিক আহমেদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব ড. আবুহেনা মোস্তফা কামাল। 

লেখক-প্রকাশক আড্ডায় ‘প্রবাসে বাংলা বইমেলা’ শিরোনামের পর্বে অংশগ্রহণ করে ড. আবুহেনা মোস্তফা কামাল, কবি আসাদ চৌধুরী, দিলারা হাফিজ, হাসানাত আব্দুল্লাহ, শেলী জামান খান, মনিরুল হক, হুমায়ুন কবির ঢালী, অরপি আহমেদ, মেসবাহ আহমেদ, ও লুৎফর রহমান চৌধুরী। জসিম মল্লিকের সঞ্চালনায় ‘কথোপকথন’ পর্বেও তারাই অংশগ্রহণ করেন। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে নির্মিত মিউজিক ভিডিও ‘বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা’ প্রদর্শন করা হয় সমাপনী পর্বে। ‘বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা’ গানটি লিখেছেন ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাসরত লেখক-সাংবাদিক অরপি আহমেদ। সুর করেছেন শফিক তুহিন। কণ্ঠ দিয়েছেন শফিক তুহিন, রুমানা ইতি, ও কিশোর দাস। ভিডিও নির্মাণ করেছেন আব্দুল্লাহ চৌধুরী। এতে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ৯ মিনিটের গানে তুলে আনা হয়েছে। 

সবশেষে শহীদ খন্দকার ও শিক্ষা রউফের সংগীত পরিবেশনার পর ‘আলোকে আঁধার হোক চুর্ণ’ শ্লোগানে শুরু হওয়া টরন্টো বাংলা বইমেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন সাদী আহমেদ।