গত ২০ জুন ২০১৯ লস এঞ্জেলেস কন্সুলেট অফিসে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের কর্ম তৎপরতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত সভায় বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের অংশগ্রহণ ও অবদানের বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন নিউ ইয়র্ক থেকে আগত জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ফাস্ট সেক্রেটারি প্রেস মোহম্মদ নূরএলাহী মিনা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ডেপুটি কন্সাল জেনারেল ওয়ালিটর রহমান। পবিত্র কোরআন তেলওয়াত দিয়ে শুরু হয় উক্ত সভা। শুরুতেই বক্তব্য রাখেন লস এঞ্জেলেস কন্সাল জেনারেল প্রিয়তোষ সাহা। তিনি বলেন, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে বিশ্ব সভায় আজ বাংলাদেশ আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘে এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সুপরিচিত।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ফাস্ট সেক্রেটারি প্রেস নূরএলাহী জাতিসংঘে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও অবদানের বিষয়ে বিশেষ কিছু তথ্য প্রবাসী কমিউনিটির সামনে সচেতনতার জন্য তুলে ধরেন। তিনি বিষয়গুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। একটি ছিল দেশের তাৎপর্যপূর্ণ গৌরবউজ্জল অধ্যায়ে বিশ্বের বুকে দেশের মর্যাদার কর্মকান্ড এবং অপরটি ছিল রোহিঙ্গা সমস্যা। তিনি বলেন, আপনারা প্রবাসী বাংলাদেশী আমেরিকান এই সমস্যার সমাধানে অগ্রণীভূমিকা রাখতে পারেন। আপনাদের আউটরিচ কর্মকান্ড সমস্যাকে তরান্বিত করতে সহায়ক হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ থেকে প্রথমবারের মতো এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ এমডিজি বাস্তবায়ন করেছে এবং এসডিজি বাস্তবায়ন করে চলেছে।

তিনি বলেন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ ট্যুপস/পুলিশ অবদান দেশ সমূহের মধ্যে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৮১ জন শান্তিরক্ষি জাতিসংঘের ৫৪টি সিসিকিপি, মিশনে অংশ নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৬১৬ জন নারী সদস্য। আর বর্তমানে ১০টি মিশনে নিয়োজিত রয়েছেন ৬ হাজার ৭০৫ জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এ পর্যন্ত শহীদ হয়েছেন ১৪৬ জন আর আহত ২২৭ জন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে চলছে ৩১ বছর।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ অভিবাসন বিষয়ে বিশেষ ভূমিকার কাথা উল্লেখ করে বলেন, ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো অভিবাসী মানুষের কল্যাণে জাতিসংঘে আলাদা গ্লোবাল মাইগ্রেশন কম্প্যাক্ট এর প্রস্তাবনা নিয়ে আসে। জলবায়ু পরিবর্তন বোধে প্যারিস এগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধে জাতিসংঘের সকল সংশ্লিষ্ট ফোরামে স্থায়ী মিশন সক্রিয় রয়েছে।

আমাদের ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যা আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে স্থায়ী মিশন নানাবিধ কাজের কথা উল্লেখ করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের এসডিজি সামিট, ক্লাইমেট এ্যাকশন সামিট, হাই-লেভেল ডায়ালগ ফর ফাইনান্সিং ফর ডেভোলপমেন্ট, হাই-লেভেল মিটিং অন ইউনিভার্সাল হেলথ কাকারেজ অধিবেশন সমূহে অংশগ্রহণ করে সমাদৃত হয়েছেন এবং ৭৩তম সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের সপ্তাহে অংশগ্রহণ কালে দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। জাতিসংঘের নির্বাচনে জয়লাভ ও নেতৃত্ব প্রদানকারী হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, গত ১৪ জুন জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এর সদস্য পদে ২০২০-২০২২ মেয়াদের নির্বাচনে বাংলাদেশ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। ১৯১ ভোটের মধ্যে ১৮১ ভোট পেয়ে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ২০১৯-২০২১ মেয়াদে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন ওআইসির নিউ ইয়র্ক চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছে, নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের দক্ষতাপূর্ণ কার্যক্রমের স্বীকৃতি স্বরুপ জাতিসংঘের ফেসিনিয়েশন এর দায়িত্ব পেয়েছে, বিভিন্ন থিমেটিক বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে, শান্তির সংস্কৃতি রেজুলেশন নিয়ে ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ, শান্তি বিনির্মাণ ও সহিংসতা প্রতিরোধে এবং নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ভূমিকা অগ্রণীয় এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠা করেছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বিভিন্ন প্লাটফর্মে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আলোচক জানান।

তিনি অন্যান্য নানাবিধ বিষয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের মাধ্যমে দেশের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের কথা বলতে গিয়ে আরও উল্লেখ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সকল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপন, গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, এন ডিজি অর্জন, এস ডিজি বাস্তবায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, কৃষি, দারিদ্রসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমূখী শিল্পয়ান, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানী আয় বৃদ্ধি সহ ব্যাপক অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের ইর্ষান্বিত অগ্রযাত্রা দেখছে। আমরা পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল সহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করেছি এবং করে যাচ্ছি।

এছাড়া আলোচনার মূল বিষয়ছিল রোহিঙ্গা সমস্যা। এবিষয়ে লিটল বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী মশহুরুল হুদা প্রশ্ন করেন- রোহিঙ্গাদের কারণে দেশে সৃষ্ট পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে সরকার কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন?  

এছাড়া ফিরোজ আলম প্রশ্ন করেন- সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা কোন সমস্যা কি না?

আলোচনার শেষে রোহিঙ্গাদের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাতৃভূমি’ প্রদর্শীত হয়। সভা শেষে আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল।

উক্ত সভায় কমিউনিটির সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ব্যাক্তিবর্গের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- লিটল বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি কাজী মশহুরুল হুদা, সাধারণ সম্পাদক লস্কর আল মামুন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমানসহ সোহেল রহমান বাদল, কাজল, ফিরোজ আলম, জাহাঙ্গীর, কামরুল হাসান, আজিজ মোহম্মদ হাই, মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দীন, ড্যানী তৈয়ব প্রমুখ।