কাজী মশহুরুল হুদা :
প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটির এক একজন দেশের এ্যাম্বাসেডর। কারণ তারা প্রবাসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের মাধ্যমে দেশের শিল্প, সাহিত্য তথা কৃষ্টি ফুটে ওঠে। এক কথায় দেশ ও জাতির প্রতিচ্ছবি। তবে বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থানের মাত্রা ভিন্নতর। আমি এখানে আমেরিকার মাত্রা নিয়ে আলোকপাত করব।

আমেরিকা ইমিগ্রেন্ট দেশ। এখানে বিভিন্ন দেশের জাতিগত মানুষের বসবাস এবং নাগরিকত্বের অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ আমরা প্রবাসী বাংলাদেশী আমেরিকা। বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি (জন্মগতভাবে), আর আমেরিকা আমাদের হোমল্যান্ড (বাসস্থান হিসেবে)।

এই প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি হিসেবে আমরা নিজেদের জন্য ফেডারেশন করেছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন করেছি, সামাজিক, ক্রীড়া ইত্যাদি সংগঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক অথবা কমিউনিটি ভিত্তিক প্রবাসীদের জন্য পিকনিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের মাঝে আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডের ব্যাবস্থা করেছি। এখান থেকে দেশের মানুষদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও সহায়তা করেছি এবং করছি। লিটল বাংলাদেশ নির্মাণ করে গর্ববোধ করছি। কমিউনিটির মানুষ হিসেবে দেশের মূলধারা থেকে ফুডস্টাম্প মেডিকেল সহ স্কুলের উচ্চ শিক্ষার জন্য অর্থের সাহায্য নিচ্ছি। হাউজি সহ সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে এই হোমল্যান্ডে বসবাস করছি। কিন্তু বাংলাদেশী আমেরিকান হিসেবে কতটুকু নিজেদেরকে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করছি বা আমরা হোমল্যান্ডের জন্য নিজস্ব কৃষ্টির মাধ্যমে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করার মাধ্যমে অন্যান্য কমিউনিটি তথা, মূলধারার কমিউনিটির সাথে যোগসাজরে একসাথে মিলে বৃহত্তর কমিউনিটিতে সময় ব্যায় করছি, এটাই এখন প্রশ্ন। যদিনা করে থাকি তাহলে নিজেদেরকে একান্ত স্বার্থপর হিসেবে ভাবতে হবে। লস এঞ্জেলেসকে উদাহরণ হিসেবে ধরেই আলোকপাত করি। বিভিন্ন দেশের, শত শত কমিউনিটি বসবাস করে এই কমিউনিটিতে। লস এঞ্জেলেসকে বলে মেন্টিংপট সিটি। ভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন কৃষ্টির সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। বাংলাদেশ তাদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র কমিউনিটি কিন্তু এখন আর মেল্টিংপট সিটি বলা হয় না। এটিকে বলা হয় রেনবো (রামধনূ) সিটি। প্রতিটি কমিউনিটির নিজস্ব বৈশিষ্ট গড়ে উঠেছে। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এক একটি কমিউনিটি ভিন্ন রং এর রঞ্জিত। বাংলাদেশ কমিউনিটিও তাদের একটি। কিন্তু নিজেস্ব রং সৃষ্টি করতে এখনও পারেনি। রং তখনই সৃষ্টি হবে, যখন নিজেস্ব গণ্ডি থেকে বেরিয়ে, নিজেস্ব সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আপন সংস্কৃতিকে অন্যের সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে। নানা রং এর সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় রামধনূ। লস এঞ্জেলেসের দিগন্তে নিজেস্ব সংস্কৃতির রং তুলে ধরতে হবে অন্যের সাথে হোমল্যান্ডের আকাশে। তবেই না উজ্জীবিত হবে আমাদের কর্মকাণ্ড।

প্রবাসে নিজ কর্মকাণ্ডকে সেতুবন্ধনের মাধ্যমে তুলে ধরলেই দেশের, জাতির কথা স্মরণীয় হবে মার্কিন মুল্লুকে। এখন প্রশ্ন হলো- এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর উপায় কি?
এর জন্য আমাদেরকে আরও একটি ধাপে উঠতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। আমরা এখন যে পর্যায়ে আছি তার সাথে বা পাশাপাশি নিজেদেরকে লস এঞ্জেলেস কমিউনিটির সাথে সরাসরি জড়াতে হবে। নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে অন্যের পাশাপাশি হাতে হাত ধরে তুলে ধরতে হবে। তার জন্য কতগুলো প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি আছে। বর্তমানে আমরা নিজেদের জন্য এমনকি নিজদেরকে প্রদর্শন করছি যা অন্যরা দেখছে, যেমন বাফলা প্যারেড করছে।

কিন্তু তার মাধ্যমে যোগসূত্র সৃষ্টি হচ্ছে না। এই কমিউনিটিকে রাজনৈতিক পটভূমিতে অংশগ্রহণ করতে হবে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য, নিজেস্ব অবস্থানকে সামাজিকভাবে বলিষ্ট করতে হলে মূলধারার কমিউনিটির সাথে যৌথভাবে কাজের মাধ্যমে নিজেস্ব সংস্কৃতি ও বাণিজ্যকে তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশী কমিউনিটি এখনও নবীন।
আমি নেবারহুড কাউন্সিলের মাধ্যমে এই এঞ্জেলিনো কমিউনিটিতে প্রবেশ করাতে এই অনুভূতি লেখার প্রেরণা ও উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। কমিউনিটিকেশন হয়েছে বিভিন্ন কমিউনিটির কার্যক্রমে। নেবারহুড কাউন্সিল লস এঞ্জেলেস সিটি গভমেন্টের তৃণমূল অবস্থান। এখান থেকে রাজনীতির সূত্রপাত।
বিভিন্ন এলাকা ঘিরে এই লস এঞ্জেলেসে ৯৯টি বর্তমানে নেবারহুড কাউন্সিল রয়েছে। কমিউনিটির মানুষ যে যেখানে বসবাস করেন সেখানে রয়েছে এ ধরণের কাউন্সিল। নিজ কমিউনিটিকে তুলে ধরতে মূলধারার রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে হবে। ভোট কমিউনিটির একটি বিরাট সম্পদ। রাজনীতিবিদদেরকে যদি বোঝানো যায় আমাদের কমিউনিটিতে ভোট সম্পদ আছে তাহলে, তাদের দৃষ্টি পড়বে কমিউনিটির উপর। তার জন্য অংশগ্রহণ করতে হবে ভোট প্রদানে। প্রথমত : নেবারহুড কাউন্সিল মিটিংগুলোতে অংশগ্রহণ প্রাথমিক পথ, দ্বিতীয়ত : নির্বাচনী ভোটে অংশগ্রহণ করা। আপনার অংশগ্রহণ কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব বহন করে। কষ্ট করে, সময় ব্যায় করে ভোট প্রদানে অংশগ্রহণ গণনায় অন্তভূক্ত হয় কমিউনিটি কত শক্তিশালি। যতবেশি শক্তিশালি ততবেশি সুবিধাভোগ করা যাবে। যত বেশি অংশগ্রহণ করা হবে, তাদের মধ্য থেকে রাজনৈতিক প্রতিনিধি সৃষ্টি হবে। অতএব, স্কুল ডিষ্ট্রিক ভোট, নেবারহুড কাউন্সিল ভোট, প্রেসিডেন্টিয়াল ভোট, যতরকম ভোট হয় তাতে আমাদের সকলকে কমিউনিটির দায়িত্ব হিসেবে অংশ গ্রহণের শপথ নিতে হবে। দেশের জন্য, কমিউনিটির মানুষের জন্য। প্রবাসী রাজনীতির মধ্যমে কমিউনিটির দেশ ও জাতির উন্নয়ন নিহিত আছে, দেশের দলীয় রাজনীতিতে নয়। দেশীয় রাজনীতি, হোমল্যাণ্ডে কোন কোন উন্নয়ন বা উন্নতিতে সহায়ক নয় (বরং বে আইনি)। এরপর আমাদেরকে অংশগ্রহণ করতে হবে বিভিন্ন কমিউনিটির ইভেন্টে সেই সঙ্গে আমাদের ইভেন্টগুলোতে বিভিন্ন কমিউনিটিকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তার জন্য মডেল ওয়ার্ক হিসেবে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। যেখানে দল, মত, নির্বিশেষে কমিউনিটির স্বার্থে সকলের প্রতি আহ্বান থাকবে অংশগ্রহণ, সহায়তা, সহযোগিতা ও সমর্থনের। লস এঞ্জেলেসে বিভিন্ন কমিউনিটিতে সাংস্কৃতিক উৎসব, মেলা ও প্যারেড হয়। এই ইভেন্টে বাংলাদেশী কমিউনিটি হিসেবে থাকবে আমাদের অংশগ্রহণ এবং পারস্পারিক ভাবে আমাদের ইভেন্ট সমূহে থাকবে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ। এই সেতুবন্ধনের প্রকল্প শুরু হচ্ছে এ বছর ২০১৯ সাল থেকে। যেমন- ইতিমধ্যে আমরা লোটাস ফেস্টিবলে মোহম্মদ এহসান এর সহায়তায় অংশগ্রহণ চালু আছে এবং নিয়মিত থাকবে। এছাড়া রয়েছে ইকোপার্ক কমিউনিটি প্যারেড, যা হয় প্রতিবছর ডিসেম্বরে কোরিয়ান কমিউনিটি চার দিন ব্যাপী আয়োজন করে প্যারেড ও ফ্যাস্টিবল।

লেভিট প্যাভেলিয়ন প্রতিবছর গ্রীষ্ম কনসার্ট করে, থাই কমিউনিটির মেলা হয়। ফিলিপিনো প্যারেড ফেস্টিবল সহ লস এঞ্জেলেস কমিউনিটিতে হচ্ছে মূলধারার বিভিন্ন কালচারাল কার্যক্রম। এই সকল ফেস্টিবলে বাংলাদেশ ফুড, মিউজিক ড্যান্স সহ কালচারকে তুলে ধরার ক্ষেত্র বা প্রয়াস সৃষ্টি করা গেলে তা এগিয়ে যাওয়ার আরেক ধাপ অগ্রসর হওয়া যাবে।
তার জন্য কমিউনিটিতে দুটি কালচারাল টিম নির্মিত হবে। একটি কালচারাল টিম, যেখানে কমিউনিটির সকল শিল্পী, কলাকুশলী থাকবে দেশের প্রতিনিধি হিসেবে এবং আর একটি থাকবে প্যারেড টিম। যারা বিভিন্ন প্যারেড সমূহে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে, দেশের কৃষ্টি ও কালচারকে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কমিউনিটির সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রবাসের মাটিতে নিজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার আনন্দই আলাদা। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দেশাত্মবোধ ছাড়া সম্ভবপর নয়। আমাদের আগামীর কাজ হবে এই ধরণের কার্যক্রমের মাধ্যমে লিটল বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। লিটল বাংলাদেশ কোন ভূখন্ডের সীমারেখা নয়। লিটল বাংলাদেশ হোমল্যান্ডের মাটিতে একটি জাতির ও দেশের কমিউনিটির গর্ব, অধিকার প্রতিষ্ঠার ও আদায়ের শক্তি। জয় বাংলা।