দুর্বৃত্তের আঘাতে জ্ঞান হারানোর ১২৩ দিন পর গত মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট জন্স এপিসকোপাল হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহ আলম (৭২)। নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকার বাসায় ফেরার সময় গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ১৬ বছর বয়েসী দুই তরুণ দুর্বৃত্ত তার সেল ফোন কেড়ে নিয়ে দৌড় দিলে মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম একজনকে জাপটে ধরার চেষ্টা করেন। সে সময় অপর দুর্বৃত্ত তাকে ধাক্কা দিয়ে কংক্রিটের রাস্তায় ফেলে দেয় এবং বেধড়ক লাথি ও কিল ঘুষি চালায়। তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় সেলফোনসহ দুর্বৃত্তরা দৌড়ে পালাতে সক্ষম হয়। এক পথচারী পুলিশকে ফোন করলে অ্যাম্বুলেন্সসহ পুলিশ এসে তাকে প্রথমে জ্যামাইকা হাসপাতাল এবং সেখান থেকে এলমহার্স্ট হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তিনি কমায় গেছেন বলে চিকিৎসকরা জানান।

এদিকে, বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যামাইকায় এই মুক্তিযোদ্ধা আক্রান্ত হবার প্রতিবাদে জনমনে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তৎপর হয় এবং অকুস্থলের আশপাশের দোকানের সার্ভিলেন্স ভিডিও পরীক্ষা করে দুই দুর্বৃত্তকে শনাক্ত এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। এরা হচ্ছে শাইকুয়াল কিম্বেল এবং জলিল স্টিলি। উভয়কেই জামিনবিহীন আটকাদেশ দিয়ে জেলে রাখা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নজিবপুরের সন্তান শাহ আলমের মৃত্যু সংবাদ জানার পরই আটক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টে।

গতকাল বুধবার বাদ মাগরিব জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে তার জানাজাযার পরই রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে নিউইয়র্কের বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল শামীম আহসান মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলমের কফিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম বাংলাদেশের অহংকারী নাগরিকের একজন ছিলেন। তার লাশ বাংলাদেশে নেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি সবকিছু সম্পাদন করেছি।’

এরপরই উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা তার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা হিসেবে স্যালুট প্রদান করেন। এতে অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ আহমেদ, সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার চুন্নু, সেক্রেটারি মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল বারী, নির্বাহী সদস্য  মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার, মুক্তিযোদ্ধা মনির হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাতেন প্রমুখ।

                  জাতীয় পতাকায় মোড়ানো মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলশের কফিন সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাচ্ছেন কন্সাল জেনারেল শামীম আহসান।

এ সময় প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার দুর্বৃত্তের আঘাতে মৃত্যুবরণকারী মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলমের লাশ সরকারী খরচে বাংলাদেশে নেয়ার যাবতীয় নির্দেশ প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। এর আগে এমন আক্রমণে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ এবং কুষ্টিয়া জেলা সমিতির সভাপতি গিয়াসউদ্দিন।

জানাজার পরই মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলমের লাশ জেএফকে এয়ারপোর্টে নেয়ার আগে ফিউনারেল হোমে রাখাসহ আনুষঙ্গিক সকল খরচ বহন করেছে কুষ্টিয়া জেলা সমিতি। এ তথ্য জানান এ সমিতির সেক্রেটারি আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, ঢাকা থেকে কফিন নেয়া হবে মরহুমের গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে। লাশ যাচ্ছে আমিরাত এয়ারলাইন্সে এবং তা ঢাকায় পৌঁছবে শুক্রবার সকালে।

জানাজায় প্রবাসের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার লোকজন অংশ নেন এবং মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।