জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মর্যাদাপূর্ণ সভাপতি পদে এক ঐতিহাসিক ও বিশাল বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ পদে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এই বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চূড়ান্ত বিজয়ের পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই বৈশ্বিক বিজয়ের পর তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে কোনো ছুটি বা অব্যাহতি নেবেন কি না—এমন কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বভাবসুলভ হাসিমুখে মন্তব্য করেন, ‘ভাই, এত ব্যস্ত হইয়েন না; এর আগেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে থেকে জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের সফল নজির রয়েছে।’
এক সংবাদ সম্মেলনে এই অবিস্মরণীয় অর্জনকে পুরো দেশের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে খলিলুর রহমান বলেন, ‘এই গৌরবময় বিজয় সমগ্র বাংলাদেশের এবং এটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল। আমি শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীর ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। তিনি যদি এই নির্বাচনে লড়ার চূড়ান্ত সাহসী সিদ্ধান্ত না নিতেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃঢ়ভাবে, অবিচলভাবে ও বিরোধহীনভাবে আমাদের এই মিশনকে সর্বাত্মক সমর্থন না করতেন, তাহলে দীর্ঘ ১০ বছরের এই কঠিন কূটনৈতিক রাস্তা আমরা মাত্র ১০ সপ্তাহে সফলভাবে অতিক্রম করতে পারতাম না।’
এই বিজয়ের নেপথ্য কারিগরদের স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব স্তরের কর্মকর্তা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশী দূতাবাসের কূটনীতিকরা দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এছাড়া আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা—আমরা সবাই যে অনবদ্য ‘টিম স্পিরিট’ নিয়ে মাঠে কাজ করেছি, এই বিজয়ের পেছনে তাঁদের অবদান ছিল বিপুল। এই ঐতিহাসিক বিজয় আমরা পরম শ্রদ্ধায় বাংলাদেশের উদীয়মান সোনালী ভবিষ্যতের কাছে উৎসর্গ করছি।
সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেন, আপনি এখন এই বিশ্ব পদের জন্য ঢাকার দায়িত্ব থেকে কোনো ছুটি নেবেন বা চাকরি ছাড়বেন কি না—তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মৃদু হেসে জবাব দেন, ‘চাকরি ছাড়ব কি না, এটাই তো জানতে চাচ্ছেন? না না, ছুটি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই! ভাই, এত ব্যস্ত হওয়ার আসলেই কিছু নেই। আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত, আমি তখন তাঁর একান্ত সচিব ছিলাম এবং তার সাথে খুব কাছ থেকে কাজ করার বিরল অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। উনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সভাপতি—দুই পদেই পূর্ণকালীন ও সফলভাবে কাজ শেষ করেছিলেন।’
তিনি আরও যুক্ত করেন, ওই সময়টা ছিল সম্পূর্ণ ইন্টারনেট-পূর্ব এনালগ যুগ; কিন্তু আজকের আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যেখানে আপনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট ও ডিজিটালি সংযুক্ত, সেখানে দুটি আন্তর্জাতিক কাজই একই সাথে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা সম্ভব এবং বিশ্বে এটা এখন খুব স্বাভাবিক বিষয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণের ভুল ব্যাখ্যা বা ধোঁয়াশা পরিষ্কার করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা করছেন যে, বর্তমানে জার্মানির যিনি জাতিসংঘে আছেন, তিনি তো নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। আসলে বিষয়টি তা নয়, ভেতরের তথ্য হচ্ছে—তিনি জার্মানির গ্রিন পার্টির একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের দল গ্রিন পার্টি সে দেশের সাধারণ নির্বাচনে হেরে যায় এবং নতুন কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। এই রাজনৈতিক কারণে তিনি আর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারেননি, পদত্যাগের সাথে জাতিসংঘের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’ ফলে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে খলিলুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির বৈশ্বিক দায়িত্বও সমান দক্ষতায় বিশ্বমঞ্চে পরিচালনা করবেন।
More Stories
ওমরাহ করতে গিয়ে হুথির হামলায় প্রাণ হারালেন মাদ্রাসা শিক্ষক নাসরুল্লাহ
পবিত্র ওমরাহ পালনের নিয়ত নিয়ে শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মাওলানা নাসরুল্লাহ। স্বজনদের আশা ছিল, প্রিয় মানুষটি পবিত্র ভূমিতে...
দিল্লিতে আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশে জামায়াত দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে: রাশেদ খান
দিল্লিতে বসে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ...
জনগণের প্রতিটি পয়সা দেশের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া জনগণের অর্থের প্রতিটি পয়সা যেন সঠিকভাবে দেশ ও মানুষের স্বার্থে ব্যয় হয়।...
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশকে প্রস্তুত করা: হুমায়ুন
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশকে একা করে রাখা নয়; বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য দেশকে প্রস্তুত করা।...
আওয়ামী লীগ দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করেছিল: আখতার হোসেন
আওয়ামী লীগ আসলে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন।...
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি ‘একটি গেম চেঞ্জার’: আশিক চৌধুরী
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তিকে ‘একটি গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ...
