Read Time:10 Minute, 21 Second

গণভোটের জনরায়কে উপেক্ষা করে সংস্কারকে ভুলিয়ে দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি সামনে নিয়ে আসা হয়েছে বলে সরকারী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সদস্যরা।

মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে বিরোধী দলীয় নেতা মো: শফিকুর রহমানের উত্থাপিত মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন।

এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। কার্যপ্রণালী বিধি-৬২ (মুলতবি প্রস্তাব) অনুযায়ী বিরোধী দলীয় নেতার উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান প্রসঙ্গে জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনা।

এতে আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য পটুয়াখালী-২ আসনের শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে জাতিকে নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিগত দেড় বছর নির্বাচন বলে বলে বিচার ও সংস্কারকে ভুলিয়ে দিয়েছিলাম। এখন নখের কালি (ভোটের অমোচনীয় কালী) শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে জুলাই সনদকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সন্তানরা সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে এটা কী লিখেছিল? যে আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছি? সেদিন আমাদের সন্তানরা বুকে গুলি বিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে রাস্তায়।‌ ব্যারিকেড দিয়ে লিখেছিল ‘রাস্তা সংস্কার নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’। আমরা যেন, সংস্কারের কথাটা মাথায় নিতে পারছি না। সংস্কারের পরিবর্তে আমরা এখন সংশোধনের দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনীর জন্য তো আমাদের তরুণরা আমাদের সন্তানরা কাজ করেনি। সংশোধনের জন্য সেদিন শেখ হাসিনাও প্রস্তাব করেছিল- ২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে তোমরা সংশোধনের জন্য আসো। সেদিন ছাত্র-জনতা সংশোধন মেনে নেয়নি, তারা সংস্কারের জন্য কথা বলেছেন। আজকে কেন সংস্কারটা মাথায় নিতে পারছি না। আমরা প্রয়োজনটাকে সংবিধানের ধারাবাহিকতার মধ্যে আটকে ফেলেছি। সংবিধানের দাঁড়ি-কমা, সেমি-কোলন খুজঁছি। আমাদের ৩০ দিনের মধ্যে যেটা করার কথা ছিল- তা না করে খালখনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিকার্ডে গুরুত্ব দিলাম। অথচ যেটার জন্য আমরা নির্বাচন করে এখানে কথা বলার সুযোগ পেলাম-সেটার দিকে আমরা কেন নজর দিতে পারলাম না।

তিনি বলেন, ৫১ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছেন আর ৭০ শতাংশ জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাহলে আমরা সেই ১৭ বছরের মতো ‍উন্নয়নের কথা বলে মূল জায়গা থেকে জনগণকে আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি? আমরা সবার আগে বাংলাদেশ তো লক্ষ্য করছি না। আমাদের আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার জায়গাটা এখানেই। ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক ও ৪২টি জেলা পরিষদ প্রশাসক নিয়োগে কী আমরা সরকারি দলের বাইরে একটা যোগ্য লোককেও খুঁজে পেলাম না? আমর কী এখানে ন্যয্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে কাউকে পেলাম না। আমরা কী সেই নতুন বাংলাদেশের পথে যেতে পেরেছি। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রশাসক নিয়োগকে গণতন্ত্র বিরোধী বললাম আর এখন গণতান্ত্রিক সরকারের সময় নিজ দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়ে কী বলতে পারি সবার আগে বাংলাদেশ?

জামায়াতের এই এমপি বলেন, সরকারি দল থেকে বলা হয় আমাদের (সংবিধান সংস্কার পরিষদের) শপথ নাকি অবৈধ হয়েছে। এটা যদি অবৈধ হয় তাহলে শপথের জন্য যারা কাগজ উপস্থাপন করেছে তাদেরকে আগে আইনের আওতায় আনা উচিত। এই অবৈধ প্রলোচনা আমাদের কে দিয়েছেন? এই কাগজ তো আমি বাউফল থেকে নিয়ে আসিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কোন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে আজকের এই সংসদে এসেছি, আমরা সকলেই সেটা জানি। সেই প্রেক্ষাপট যখন বাংলাদেশে সংগঠিত হলো, তারপরে ৫ আগস্ট থেকে নিয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন সরকার ছিল না। সেই সময়টাতে সংবিধান কতটুকু কার্যকর ছিল? সেই ব্যাপারে কি আমরা খোঁজখবরটা রেখেছি?

আখতার হোসেন প্রশ্ন রাখেন, বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন অ্যাটর্নী জেনারেল হিসেবে কিভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথের বর্ণনা সংবিধানের কোথাও নেই।

আখতার হোসেন বলেন, আগের সরকার তারা যে পদত্যাগ করেছে সেই পদত্যাগের ফর্মুলা কি? সংসদ যে ভেঙে দেওয়া হলো ৬ তারিখে, সেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার ফর্মুলাটা কি সংবিধানে বর্ণনা করা ছিল? তার কোনো কিছুই সেই সময়টাতে সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। কারণ সেই সময়টাতে চব্বিশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যয়ে জনগণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল।

এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র কাঠামোটাকে সংস্কার করা। রাষ্ট্র কাঠামোকে বারংবার একটা ফ্যাসিবাদীর যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টাতে ঐক্যমত্য কমিশন গঠিত হয়।

ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, সেই আলোচনার এক প্রান্তে গিয়ে যখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আসে সেটা নিয়ে আমরা কয়েক দফায় আলোচনা করেছি। সেই আলোচনায় আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেব সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জোনায়েদ সাকি ভাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নুরুল হক নূর উপস্থিত ছিলেন। শাহাদাত হোসেন সেলিম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এতগুলো মানুষ সরকারি দলের বেঞ্চে তারা বসে আছেন। তারা ঐক্যমত্য কমিশনে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঐক্যমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সকলের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনার প্রসঙ্গ তারা সংসদে এসে কিভাবে ভুলে গেলেন সেটা আমি তাদের কাছে জানতে চাই।

তিনি বলেন, তারেক রহমান আমাদের প্রধানমন্ত্রী তিনি ৩০ জানুয়ারি রংপুরে আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিন। দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার কথা বলে তাঁরা এখন এসে গণভোটের রায় মানতে কেন চান না সেই প্রশ্নটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করতে চাই।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে। জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা ধৃষ্টাতাপূর্ণ, সংসদকে কলঙ্কিত করা। গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করা হোক না হোক গণভোটকে অবৈধ করার কোনো সুযোগ নাই।

জুলাই সনদে চাওয়া হয়েছে আগের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হবে না, এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি নতুন বাংলাদেশের কথা বলেন আপনারা কি আবার আগের মতো করে নূরুল হুদার মতো একজনকে আপনারা কি নির্বাচন কমিশনার বানাতে চান? নাকি আপনারা সেই ২০০১ থেকে ৬-এর মতো আপনাদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করে কেএম হাসানের মতো একজনকে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে এসেছিলেন তারপরে ১৭টা বছর বাংলাদেশকে যে মাসুল দিতে হয়েছিল সেই ইতিহাসগুলো যে আপনারা ভুলে গিয়েছেন, সেটা আমাদের কাছে বড়ই দুঃখ লাগে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post সংসদ অধিবেশনেও দায়িত্বে সচেতন, পত্রিকায় চোখ প্রধানমন্ত্রীর
Close