সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গুলশানের আলিশান ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে থাকা তার পরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গুলশানের র্যান্কন টাওয়ারে চারটি আধুনিক ফ্ল্যাট একত্র করে তৈরি করা ডুপ্লেক্স ইউনিটের এসব ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিলামের জন্য ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত একটি নিলাম কমিটি গঠন করেছেন।
সোমবার (২১ জুলাই) অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় যে, কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিলামে তোলা হবে। বৈঠকে নিলাম প্রক্রিয়ার ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তা সম্পন্নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে বেনজীর আহমেদের জব্দকৃত সম্পদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্পদের বিবরণী তৈরি করতে গিয়ে নিলাম কমিটির সদস্যরা বিস্মিত হয়েছেন- প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির ব্যাপকতা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে শত কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
ইনভেন্টরি কমিটির এক সদস্য জানান, ফ্ল্যাটের ব্যবহৃত জিনিসপত্র তালিকাভুক্ত করার সময় মনে হয়েছে যেন আমরা ফিলিপাইনের সাবেক শাসক মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের সম্পদের তালিকা তৈরি করছি। আশির দশকে যাদের বিলাসবহুল জীবন বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ইমেলদা মার্কোসের অসংখ্য জুতা, দামি পোশাক ও প্রসাধনী সামগ্রীর মুখরোচক গল্প তখন সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এ যেন বেনজীর দম্পতির সঙ্গে মার্কোস দম্পতির জীবনের আশ্চর্য মিল।
তিনি আরও জানান, বেনজীর আহমেদের গুলশানের আলিশান ফ্ল্যাট থেকে জব্দ করা ২৪৬টি আইটেমের তালিকা দেখে সম্পদের মাত্রা বোঝা যায়। শুধু একটি ফ্ল্যাট থেকেই তার পরিবারের ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- শার্ট ১২২টি, প্যান্ট ২৬৬টি, ব্লেজার ৩০টি, স্যুট ৮টি, টি-শার্ট ৭২২টি, পাঞ্জাবি ২২৪টি, পায়জামা ৪৭টি, স্যান্ডেল ৮৮ জোড়া, কেডস ৩৫ জোড়া, জুতা ৩৮ জোড়া, শাড়ি ৪৯৪টি, থ্রিপিস ২৫০ সেট, সালোয়ার-কামিজ ৪৯৬টি, ব্লাউজ ৬৫টি, জামা ২১২টি, জ্যাকেট ৫৬টি, বেডশিট ১০৯টি, লেডিস ভ্যানিটি ব্যাগ ৭৫টি, লেডিস টপস ৬২২টি, পুরুষদের সোয়েটার ১১টি ও নারীদের ৩৪টি, লেডিস প্যান্ট ৩৫৫টি, লেডিস টি-শার্ট ২৮টি, নাইট ড্রেস ৫৮টি, ওড়না ৩৪৭টি, শাল ও চাদর ৮৯টি, শীতের জামা ১৩২টি, লেহেঙ্গা ১৬টি, সানগ্লাস ৩৪টি এবং ট্রাউজার ৬৭টি।
সেন্ট-পারফিউম ছাড়াও ড্রয়িংরুম, বৈঠকখানা, থিয়েটার রুম, করিডোর, কিচেন, মাস্টার বেডরুমসহ অন্যান্য বেডরুমের ব্যবহৃত সামগ্রী জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গুলশানের র্যান্কন টাওয়ারে ফ্ল্যাট নম্বর ১২/এ, ১২/বি, ১৩/এ ও ১৩/বি- এই চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট একত্র করে বেনজীর দম্পতি একটি অত্যাধুনিক ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট নির্মাণ করেন। ওই ডুপ্লেক্স ইউনিটে রয়েছে সুইমিংপুল, মিনি থিয়েটার, অতিথি বিনোদনের আলাদা বৈঠকখানা এবং অন্যান্য আধুনিক ও আভিজাত্যপূর্ণ সুবিধা।
অনুসন্ধান টিম জানিয়েছে, পুরো ফ্ল্যাটে ১৯টি ফ্রিজ রয়েছে। এসি রয়েছে সব মিলিয়ে ১০০ টন, সুইমিংপুলে ব্যবহৃত আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী। ফ্ল্যাটের খাট, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, সোফা, চেয়ার, আলমিরা, ওয়্যারড্রোবসহ মূল্যবান সামগ্রী নিলাম বহির্ভূত রাখা হয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগেই ২০২৪ সালের ৪ মে বেনজীর আহমদ মিথ্যা তথ্য দিয়ে নতুন পাসপোর্ট করিয়ে তার স্ত্রী ও কন্যাদের নিয়ে গোপনে দেশত্যাগ করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নিলাম কমিটির তদন্তে জানা গেছে, বেনজীর দম্পতি পালানোর সময় ব্যাগ ভর্তি স্বর্ণালংকার, টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে গেছেন। ইতোমধ্যে দুদক বেনজীরের বিরুদ্ধে ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে।
বেনজীরের গুলশানের ফ্ল্যাটে থাকা জিনিসপত্র নিলামে তোলার জন্য আদালত একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক সভাপতি হিসেবে থাকবেন, পাশাপাশি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের একজন প্রতিনিধি, বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ও ইস্পাত প্রকৌশল অধিদপ্তরের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে থাকবেন। দুদকের উপ-পরিচালক (সম্পদ ব্যবস্থাপনা) সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। আদালত কমিটি গঠন করার পর ফ্ল্যাটের ব্যবহৃত সম্পদের তালিকা (ইনভেনট্রি) প্রস্তুত করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা ছাড়াও তার স্ত্রী জিশান মীর্জা, বড় কন্যা ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর এবং ছোট মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে পৃথক চারটি মামলা করা হয়েছে। এই মামলাগুলো ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর করা হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, বেনজীর আহমদ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জিশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। বড় মেয়ে ফারহীন ৮ কোটি ৭৫ লাখ এবং ছোট মেয়ে তাহসীন ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন করেছেন।
More Stories
পাকিস্তানে ১৪ বছর পর নামল বাংলাদেশের বিমান, ওয়াটার স্যালুটে অভ্যর্থনা
পাকিস্তানের মাটিতে দীর্ঘ ১৪ বছর পর নামল বাংলাদেশের বিমান। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম দ্য ডনের খবর অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ...
নির্বাচিত হলে পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে কামড়াকামড়ি করব না: জামায়াত আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জনগণ যদি তাদের পবিত্র মূল্যবান ভোট দিয়ে এই জোট, এই ঐক্যকে নির্বাচিত...
এনসিপির ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
নতুন রাজনৈতিক দল ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে...
ধানের শীষের সঙ্গে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দেবেন : তারেক রহমান
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার সঙ্গে সংস্কারের পক্ষে গণভোটে হ্যাঁ-তে রায় দেওয়ার জন্য আহ্বান...
গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন না সরকারি চাকরিজীবীরা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া থেকে...
জামায়াত আমাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিল: মুফতি রেজাউল করিম
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেছেন, ‘জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোট গঠন করে আমরা এগুচ্ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে...
