আহমেদ ফয়সাল, (ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র) :

কূটনীতির ফাঁদে আটকে গেছে বাংলাদেশের স্বামী নামক(ভারত)দেশটি। এমন ভাবে আটকে গেছে যে, স্ত্রী (বাংলাদেশ) এখন স্বামীর জন্য উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করতে পারছে না, শোক প্রকাশ করা তো দূরের কথা।

ইন্ডিয়ার ২৬ জন জওয়ানকে চায়নারা নির্দয়ভাবে পিটিয়ে মারলো! কোনো যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই চায়নারা ইন্ডিয়ার ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলো। নেপালের মত এক ক্ষুদ্র ও শক্তিহীন দেশও ইন্ডিয়ার ভূমি তাদের মানচিত্রে অধিগ্রহণ করে নিলো। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ব্যাতিত ইন্ডিয়া ইহার সবকিছুই অস্বীকার করে আসছিলো। ‘কিল খেয়ে কিল চুরি’ করা ছাড়া ইন্ডিয়ার কিছুই করার ছিলোনা। কিন্তু হাটের মাঝে কিল পরলে কিল লুকানো যায়না। সবকিছুই বের হয়ে আসছে।

এমন বর্বরোচিত ঘটনার স্বভাবতই নিন্দা জানানো উচিৎ। কিন্তু কূটনীতি বা Diplomacy এমন একটা জিনিস, কখনো কখনো কঠিন তিক্ততাও জৈষ্ঠ্যমধু মনে করে হজম করে যেতে হয়। নাথিং রং হিয়ার। এতে দোষের কিছু নেই। দেশের স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। দেশের স্বার্থেই কূটনৈতিক তথ্য উপাত্ত ও তাহার কলাকুশলীদের রাষ্ট্রীয় প্রটেকশন দিতে হয়। বিশ্বে কোন দেশই এই নিয়ম লঙ্ঘন করেনা। সরকার পরিবর্তন হলে বড়জোর কূটনৈতিক শত্রু মিত্র বা কেবলা পরিবর্তন হয়। কুটনৈতিক তথ্য উপাত্ত কেহই লিক করেনা। কলাকুশলীদের নিরাপত্তার ব্যাহত করেনা কেহ।

কিন্তু সরকার পরিবর্তনে বাংলাদেশ সেই কূটনৈতিক শিষ্টাচারও ভঙ্গ করেছে। ১০ ট্রাক অস্র মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকেও! ফাঁসিয়েছে বড় বড় নেতাদের। কূটনীতির প্রধান একটা চ্যাপ্টার থাকে পর্দার অন্তরালে(Behind the scenes)। উপরে উপরে যতটা নয়, বিহাইন্ড দ্যা সিনে চলে আরো বড় খেলা। সরকার পরিবর্তন হলেও এই খেলার তথ্য উপাত্ত কেহই প্রকাশ করেনা। কূটনীতির এই ফলাফল দেশের জন্য খারাপ হলেও কেহ প্রকাশ করেনা। এটাই হলো Diplomatic etiquette বা কূটনৈতিক শিষ্টাচার। এর বিপরীতটা, অর্থাৎ দেশের নিরাপত্তামূলক গোপন তথ্য প্রকাশ করাটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। জুলিয়স এসাঞ্জ ও উইকিলিকসের কথা আমরা সকলেই জানি। উইকিলিক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যত গোপন তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকারই তা স্বীকার করেনি।

যাহোক, বলছিলাম ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক প্রসঙ্গে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে উপমহাদেশে ইন্ডিয়া একরকম একঘরে হয়ে পরেছে। পাকিস্তান তাদের চিরশত্রু দেশ।তামিল ইস্যু সমাপ্ত হওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার সাথেও সম্পর্ক মার খায়। ছোট্ট দ্বীপদেশ মালদ্বীপের সাথেও সম্পর্ক ভালো নয়। একমাত্র হিন্দু দেশ নেপালের সাথে মোড়লপনা করতে করতে, তাদের রাজনীতিতে সকাল সন্ধ্যা হস্তক্ষেপ করতে করতে সেখান থেকেও ছিটকে পরেছে ইন্ডিয়া। এর একমাত্র কারণ, ইন্ডিয়ার দাদাগীরি আচরন। তাদের এই দাদাগীরি বাংলাদেশের বেলাতে আরো শক্তিশালী।

ইন্ডিয়া বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে জানেনা। বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে জানেনা। বন্ধু দরিদ্র বা ছোট হলেও সমমর্যাদা দিতে হয়; সেটা ইডিয়ার অভিধানে নেই।কূটনীতিতে প্রতিবেশী দেশগুলির সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখতে হয় খুব সতর্কতার সাথে, সেই দেশের জনগণের মন মস্তিষ্ক বুঝে; সরকার চেঞ্জ হলেও ডিপ্লোম্যাসিতে যেন চেঞ্জ না আসে। তাই দুরদর্শি দেশগুলো সরকার, অপজিশন পার্টি ও অপরাপর শক্তিশালী পার্টিগুলির সাথে রিলেশন রাখে ব্যালান্স করে।

কিন্তু ইন্ডিয়া তার প্রতিবেশী দেশের জনগণকে এভয়েড করে শুধু সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। হোক সেই সরকার জনসমর্থনহীন, জনবিচ্ছিন্ন সরকার। জনবিচ্ছিন্ন সরকারকে প্রটেকশন দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারলে অনেক সুবিধা আছে। সেই সরকারকে সহজেই তাবেদার সরকারে পরিনত করা যায়। তাবেদার সরকারকে দিয়ে ইচ্ছেমাফিক সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নেয়া যায়। স্বর্ণ প্রাপ্তির বিপরীতে রৌপ্য, তাম্র দূরে থাক, দস্তাও খরচ করতে হয়না। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমার প্রিয় জন্মভূমি, প্রিয় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে ইন্ডিয়ার সম্পর্ক ছিলো নাকি স্বামী স্ত্রীর মত। ‘গিভ এন্ড টেইক’ ফর্মুলা ছাড়া এই সম্পর্ক বেশীদিন টিকে না।
ইন্ডিয়া বাংলাদেশের ট্রানজিট, বন্দর, ছিটমহল, পানি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, রাজস্ব, সব কিছুই ইন্ডিয়া একপ্রকার বিনা পরিশ্রমেই পেয়ে গেছে। যদি কোনো দেশের সরকার কারো দয়ায় টিকে থাকে, সেই সরকারের নৈতিক সাহস থাকেনা কোনো আগ্রাসনের প্রতিবাদ করার। এমন কোনো মাস যায়না, ইন্ডিয়া বাংলাদেশের বর্ডারে দুই-চারটা লাশ ফেলেনি। কিন্তু সরকারের সাহস হয়না একজন তৃতীয় শ্রেনীর নেতাকে দিয়েও প্রতিবাদ কিম্বা উষ্মা প্রকাশ করে।

শোষিত হওয়া বুঝতে পারলেও মুখ বুঝে সুদিনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। কূটনৈতিক কেবলা পরিবর্তনের সুযোগ এলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশ আজ সেটাই করছে। বলা বাহুল্য, চিন বাংলাদেশে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে যাচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ৮ হাজারের অধিক পন্যের ৯৭% শুল্ক মুক্তকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের চেয়ে আমাদের চিনের উপরে নির্ভরতা রয়েছে অনেক। চিনের উপরে এই নির্ভরতা বলতে গেলে সারা বিশ্বের।

১৯৭০ সালের পর এই প্রথম ভারত এক চরম ভয়াবহতম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভারতের এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সরকার তাই পুরাপুরি খামুশ। টু-শব্দটিও করতে পারছেনা। অথচ বছর খানেক আগেও ভারত পাকিস্তানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আগ বাড়িয়ে ভারতের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলো।

প্রতিবেশীর আচার আচরণে মোড়লীপনার ভাব থাকলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে দূর প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক গড়তে হয়। এটাই কূটনৈতিক বাস্তবতা। সারা বিশ্বে কূটনীতিতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ একটা ফ্যাক্টর। আজপর্যন্ত ইহাকে উপেক্ষা করতে পারেনি কোনো দেশ।সেই কূটনৈতিক প্রয়োজনের দিকে দৃষ্টি রেখেই শেখ মুজিবুর রহমান ইন্ডিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীনতার দুই বছরের মাঝে উড়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তান আয়োজিত সার্ক সম্মেলনে। সেখানে তিনি নিয়েছিলেন লাল গালিচা সংবর্ধনা। ‘হামারি ভাই’ বলে গলাগলি করেছিলেন ৭১’এর আগ্রাসী সেনাদের সাথেও।

শেখ মুজিবুর রহমান এই কূটনৈতিক নতুন কেবলার গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন তখনই, যখন দেখলেন বাংলাদেশের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার তোয়াক্কা না করেই সিমলা চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়ে যুদ্ধবন্দী বিনিময় করে নিয়েছিলো ভারত। সুযোগের অপেক্ষাতেই যেন মুখিয়ে ছিলেন তিনি। শত্রুতার ধরন প্রকৃতি ও গতিবিধি অনুসারে শত্রু মিত্রও পরিবর্তন হয়। কাল যে বন্ধু ছিলো, আজ সে শত্রু হতে পারে। কাল যে শত্রু ছিলো, আজ যে বন্ধু হতে পারে। বাংলাদেশের এখন এমন সময়ই যাচ্ছে।

কিন্তু ভারতের জন্য অনুতাপের বিষয় হচ্ছে, ‘ভারতবান্ধব সরকার ক্ষমতায় থাকতেই ভারতের প্রতি এমন তাচ্ছিল্য আসবে, তা হয়তো ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি তারা। অথচ এটাই Diplomatic reality বা কূটনৈতিক বাস্তবতা। এখন দেখার অপেক্ষায়, ভারত বাংলাদেশের স্বামী স্ত্রীর এই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে।