ফিরোজ আলম :
মুজিব বর্ষ ২০২০, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্ম বার্ষিকী । ২০২১ সনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হবে । বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং সেই জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে একটি স্বাধীন জাতির জন্ম দিয়ে,জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ইতিহাসের হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ।

মানবতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদী এই নেতা আজীবন শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন । বঙ্গবন্ধু বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন,শোষক আর শোষিত । তিনি নিজেকে শোষিতের পক্ষের হিসাবে ঘোষণা করেছেন ।

জাতির জনক নিজের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন,” আমি বাঙালি,আমি মুসলমান,আমি মানুষ । মানুষ হিসাবে তিনি যেমন বিশ্বমানবতার কথা ভেবেছেন,একজন মুসলমান হিসাবে মুসলমানদের কথা ভেবেছেন,তেমনি তার প্রথম পরিচয় একজন বাঙালি হিসাবে সর্বাগ্রে তিনি বাঙালিদের কথা ভেবেছেন । বাঙালির দুঃখ দুর্দশা তাকে বেশি ভাবিত করত ।

শুধু স্বাধীন বাঙালি সত্তা প্রতিষ্ঠা তার স্বপ্ন ছিলনা,তার স্বপ্ন ছিল সুবৃহৎ সুবিস্তৃত । সোনার বাংলা গোড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশ স্বাধীন করেছিলেন,তা সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি, তাকে করতে দেওয়া হয়নি । দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে চলার পথ রুদ্ধ করতে তাকে হত্যা করে ।

১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকেও হত্যা করা হয় । মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত নীতিমালা ও প্রতিষ্ঠানকে হত্যা করে,সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নীল নকশায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় পাকিস্তানী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে । মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হয়ে যায় ইতিহাসের নিষিদ্ধ বিষয় । বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামীলীগকে খন্ড বিখন্ড করে নিশ্চিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ।

১৯৮১ সনে নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে ধ্বংস প্রায় দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা । রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারা বাংলাদেশ ঘুরে, সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দলকে সংগঠিত করেন । দীর্ঘ লড়ায় সংগ্রাম করে একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সনে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করতে সক্ষম হয় । কিন্তু সেই সরকার ছিল দুর্বল সরকার ! দীর্ঘ একুশ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রের শিরায় শিরায় যে পাকিস্তানী রাজনৈতিক ভাবধারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল,তা ধ্বংস করা সম্ভব ছিলনা । তারপরও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যহত রাখতে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ।

নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে আবারো ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে আওয়ামীলীগ । শুরু হয় নতুন করে ষড়যন্ত্র ,একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লেলিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামীলীগকে ধ্বংস করতে । জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়,তার মধ্য ২১’শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল সবথেকে ভয়াবহ । সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে ২০০৮ এ জনগণের বিশাল সমর্থন নিয়ে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী সরকার গঠিত হয় ।

জননেত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তিনি কাজ করবেন,নির্বাচিনী ইস্তেহারের প্রতিটা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তার সরকার কাজ করবে । জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ আজ একটানা দুই যুগ ক্ষমতায় ।

সময় এসেছে মূল্যায়ন করার,বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে কি করেছে আওয়ামীলীগ সরকার ? কি ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ?

এককথায় বলতে গেলে,ক্ষুদা দারিদ্রমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন । অবকাঠামোগত ভাবে নিঃসন্দেহে গত ১২ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে বহুদূর ! পদ্মাসেতু,রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প,এক্সপ্রেস ওয়ে,মেট্রোরেল,বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট,জিডিপি,রিজার্ভ সহ সামাজিক সূচকে সকল ক্ষেত্রে উর্ধেগতি বাংলাদেশের উন্নয়নের সাক্ষ্য দেয় ।

কিন্তু এতো সব উন্নয়নের মাঝেও আমরা বড় একটা কিন্তু খুঁজে পায় ! বঙ্গবন্ধু জীর্ণশীর্ণ কৃষক অথবা ঘামঝরা শ্রমিকদের নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতেন,সেই স্বপ্ন কতদূর ? কতদূর ঔপনিবেশিক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ঠ সাধারণের মুক্তি,আইনের শাসন ? রাজাকারের বিচার,বঙ্গবন্ধুর খুনি ও জাতীয় চার নেতার খুনিদের বিচারের মাধম্যে জনগণ যে আইনের স্বপ্ন দেখেছিল,সেই স্বপ্ন কতদূর ?

এক মুজিব লোকান্তরে,লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে ! এই ঘরে ঘরে বর্ণিল সাজে মুজিব কোট পরিহিত যে মুজিব সৃষ্টি হয়েছে,তারা কি মুজিবের আদর্শ ধারণ করে ?
আধুনিক কালের এই মুজিব বাহিনী বঙ্গবন্ধুর বাকশাল পূর্ববর্তী বক্তৃতা শুনেছে,তারা কি দুনীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর হুঁশিয়ারি শুনেছে,বাংলাদেশের প্রথম সেনা অফিসার কমিশনে দেওয়া দিকনির্দেশনা জানে ?

গণমানুষের দল আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের অফিসে সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রবেশ নিষেধ, যেখানে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার বাসায় প্রবেশ অধিকার পেয়েছে সাধারণ কৃষক তার উৎপাদিত লাউ শাক আর কৈ মাছ নিয়ে।
আজও চারিদিকে চাটুকার আর লুটেরা! পুলিশ আর আমলার ভয়ে প্রজাতন্ত্রের মালিকরার আতংকিত ।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ কি এমন ? বঙ্গবন্ধুর শততম জন্ম বার্ষিকীতে বাঙালির জন্য শ্রেষ্ট উপহার হতে পারত একটি সুশাসিত বাংলাদেশ । যেখানে সাধারণ মানুষ শান্তিতে ঘুমাবে,দুর্বৃত্ত নির্ঘুম রাত কাটাবে।

হে পিতা,তোমার শততম জন্ম বার্ষিকীতে একটাই চাওয়া,তোমার স্বপ্ন সত্যি হোক তোমার প্রিয় কন্যার হাত ধরে,তোমার বাঙালি পাক একটি সুশাসিত বৈষম্যহীন উন্নত বাংলাদেশ।
শুভ জন্মদিন
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু ।