বিশ্ব অভিবাসী দিবস উপলক্ষে ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনন্য সাহসিকতার গল্প জানাল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ইতালির সিসিলি দ্বীপের শহর পালেরমোতে বাংলাদেশি এবং অন্যান্য অভিবাসীরা আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। সেখানে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দেন ইতালির কুখ্যাত অপরাধী চক্র মাফিয়া গোষ্ঠীকে। যার ফলে বহু মাফিয়া সদস্যকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

বিবিসির বাংলা বিভাগকে সেখানকার বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘প্রথম এখানে যখন আমরা আসি, আমরা ছিলাম সংখ্যায় কম। সেসময় বাঙালিরা এখানে খুব একটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ওরা বিভিন্ন সময় আমাদের ছিনতাই করতো, রাস্তাঘাটে মারত, এরকম ঘটনাগুলো ঘটতো।’

বিদেশের মাটিতে সংখ্যায় কম ছিলেন বলে নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছু বলতে পারতেন না তারা। বিশেষ করে মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস ছিল না তাদের।

স্থানীয়রা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ছিল বলে তাদের বদলে অন্য দেশের নাগরিকদের মাফিয়ারা টার্গেট করতো। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাফিয়ারা চাঁদাবাজি করতো।

আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘২০০০ সালের পর থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আমরা বাঙালিরা যখন একটু সামনে এগোতে থাকলাম, তখন ওরা আমাদের পিছু নিলো। তারা দোকান এসে বলতো একটা অনুষ্ঠান করবো বা গির্জার জন্য টাকা তুলছি। এইরকম সমস্যাগুলো করতো ওরা।’

ইতালির সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বিশ্বব্যাপী মাফিয়া নামেই পরিচিতি। অপরাধী কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বব্যাপী তারা কুখ্যাত। কোনো বিবাদকে কেন্দ্র করে পুরো পরিবার বা বিপক্ষ গোষ্ঠীকে খুন করে ফেলতে দ্বিধা করে না তারা।

মাফিয়াদের নিয়ে অনেক চলচ্চিত্র বা টিভি সিরিজের চরিত্র করা হয়েছে, যাদের জন্মই ইতালির সিসিলিতে।

এমন দুর্ধর্ষ অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সিসিলির মতো জায়গায় কীভাবে এই অভিবাসী বাঙালিরা জোট বেঁধেছিলেন? এমন প্রশ্নে আশরাফ বলেন, ‘সেটা একদিনে হয়েছে বিষয়টি তেমন নয়। ওখানে স্থানীয় কিছু সংগঠন আছে যারা মাঝে মাঝে আমাদের খোঁজ খবর নিতো। জানতে চাইতে কেউ আমাদের সমস্যা করে কীনা। তখন আমরা বিষয়টা ওদের বললাম। ওরা আমাদের মামলা করতে বলেছিল। তারা বলেছিল মামলা করলে আমরা তোমাদের সঙ্গে থাকবো।’

তিনি জানান, ঠিক এ রকম সময় একদিন এক আফ্রিকান লোককে মাফিয়ারা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় বেশ বিক্ষোভ হয়েছিল এবং মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হয় বিষয়টি। এর ফলে পুলিশ তাদের ওপর ধরপাকড় শুরু করে এবং মাফিয়ারাও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

সেটাই ছিল অভিবাসীদের সামনে এগোনোর সময়। তখন সেখানকার ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদাবাজির মামলা করেছিলেন। মাফিয়াবিরোধী সংগঠন ও অভিবাসীদের সহায়তা করে এমন সংগঠনের সহায়তায় এই মামলা হয়েছিল।

মামলার সময় তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে তাদের নাম পরিচয় গোপন রাখা হবে। আদালতেও যখন শুনানি হয়েছে তখন দুই পক্ষকে মুখোমুখি করা হয়নি। সে জন্যেই কারোর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক কিছু করতে পারেনি তখন মাফিয়ারা।

ইতালি বাংলাদেশিদের জন্য খুব জনপ্রিয় গন্তব্য। দেশের অনেক জেলা আছে যেখানে আগে যাওয়া আত্মীয়দের সহযোগিতায় আরও অনেকেই ইতালি গেছেন। পালেরমোতেই আছে ১৫ হাজারের মতো বাংলাদেশি।

আশরাফ বলেন, ‘মাফিয়া বিষয়টি এখন আর তেমন নেই। তার কারণ বয়স্করা বেশির ভাগ মারা গেছে। আর অন্যদের মধ্যে বেশির ভাগই জেলে আছে। আগের মতো মাফিয়াদের আর উৎপাত নেই। আমরা অনেক শান্তিতে আছি।’