স্পেনের কাতালোনিয়ায় স্বাধীনতাকামী ৯ নেতার কারাদণ্ডের প্রতিবাদে বার্সেলোনায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভ ধর্মঘটে বিরূপ প্রভাব পড়ছে পর্যটন নগরী খ্যাত বার্সেলোনার অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে। বিক্ষোভের কারণে কাতালোনিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। 

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন বিক্ষোভের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্পেনের অর্থনীতি। কাতালোনিয়া প্রদেশেও এর প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। ইতোমধ্যে চার হাজারেরও বেশি কোম্পানি কাতালোনিয়ার বাইরে তাদের সদর দফতর সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাইসা ব্যাংক, বাংকো সাবাদেল উল্লেখযোগ্য।  স্পেনের স্থানীয় পত্রিকা ‘এল পাইস’ বার্সেলোনার বাণিজ্য ও পর্যটন সংস্থা ‘বার্সেলোনা ওবের্তা’ এর সূত্র ধরে ২২ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে জানায়, কাতালান রাজধানীতে স্টোর ও রেস্তোরাঁগুলোতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বিক্রয় কমে গেছে। হোটেলগুলোতে পর্যটকদের অনেক বুকিং বাতিল হচ্ছে;  এমনকি পর্যটকরা শহরের হোটেল থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হচ্ছেন।

স্থানীয় পর্যটন বিভাগের প্রধান খাবিয়ের মারসে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল কর্তৃপক্ষ ও বুকিং দেওয়া পর্যটকদের সঙ্গে আলোচনা করে ঝামেলা এড়ানোর  কার্যক্রম আমরা নিয়েছি। তবে চার ও পাঁচ তারকার হোটেলগুলোতে আসন্ন মাসগুলোর বুকিংয়ে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।

ইতোমধ্যে বিক্ষোভে শহরের রাস্তাগুলোর আসবাবপত্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে বলে বার্সেলোনা সিটি কর্তৃপক্ষ তাদের অনুমানের কথা জানিয়েছে। 

গত ১৮ অক্টোবর বিক্ষোভ সহিংসতার সময় বার্সেলোনায় দোকান লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। শহরের পোর্টাল দেল আংখেলের ‘মিডিয়া মার্ক্ট’, ‘ভোদাফোন স্টোর’, ‘অ্যা ডব্লিউ ল্যাব’, ‘ফুট লকার’ এর শাখাগুলোতে লুটপাট হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের শাখা ভাঙচুর করার পাশাপাশি রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার জন্য ব্যাংকের আসবাব ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় জাতীয় পত্রিকা ‘এল পাইস’ জানিয়েছে, ১৯ অক্টোবর (শনিবার) বার্সেলোনার পুলিশ সদর দফতরে বিক্ষোভকারীরা হামলা চালানোর চেষ্টা করে। এসময় তারা পুলিশের গাড়ি ও পুলিশের দিকে আগুন, পাথর ছুঁড়ে মারে। বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশের মুখ কাপড়ে ঢাকা ছিল; এমনকি তাদের অনেককে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। 

বাণিজ্য ও পর্যটন সংস্থা ‘বার্সেলোনা ওবের্তা’ এর সভাপতি গাব্রিয়েল জেনি বলেন, ২০১৭ সালের ১ অক্টোবরের পরিস্থিতি থেকেও এবারের অবস্থা আরো খারাপ। তখন রাস্থায় ব্যাপক অস্থিরতা ছিল না। যেভাবে নিয়মিত বিক্ষোভ চলছে; আমরা জানি না কবে এর অবসান ঘটবে।

বার্সেলোনার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া গির্জার প্রবেশ মুখে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখলে ১৮ অক্টোবর গির্জা কর্তৃপক্ষ গির্জায় প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।

বার্সেলোনা বিমানবন্দর অপারেটর সংস্তা ‘আয়েনা’ জানিয়েছে বিক্ষোভের কারণে ১৮ অক্টোবরের ৯৭৯টি ফ্লাইটের মধ্যে ৭৮৯ টি ফ্লাইট ন্যূনতম পরিসেবা বিধি অনুসারে পরিচালিত হয়েছে। ‘ভুয়েলিং’ এর ৩০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
ইউকে ফরেন এ্যান্ড কমনওয়েল্থ অফিস (এফসিও) বার্সেলোনায় অবস্থানরত ইউকে‘র পর্যটকদের সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করার জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। বিক্ষোভের ক্ষেত্রগুলো এড়াতে, আশপাশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং বন্ধু ও পরিবারকে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবহিত করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বার্সেলোনায় আমেরিকার পর্যটকদের ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। স্পেনস্থ নিউজিল্যান্ড দূতাবাস নিজেদের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজেও সতর্কতার সাথে চলাফেরা করার জন্য দেশটির পর্যটকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নিয়মিত বিক্ষোভ সমাবেশের কারণে বার্সেলোনায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ব্যবসায়িক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের, যাদের হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা রয়েছে, তাদের ক্ষতির পরিমান বেশি।

বাংলাদেশি হোটেল ব্যবসায়ী উত্তম কুমার জানান, নতুন করে হোটেলের রুম বুকিং হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অনেকেই রুম ছেড়ে দিচ্ছেন। কাতালোনিয়ার উত্তর-পূর্ব প্রদেশ অঞ্চল জিরোনার এসতারতিতে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি বনি হায়দার মান্নার একটি রেস্তোরাঁ।

তিনি জানান,  পর্যটক নির্ভর আমার এ রেস্তোরাঁয় গ্রাহকদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। স্পেন বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি রাসেল হাওলাদার বলেন, কাতালোনিয়ায় এভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা করে জীবিক নির্বাহ করা কঠিন হবে।  স্পেন বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক মিরণ নাজমুল বলেন, কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা প্রশ্নে এখন যে পরিস্থিতি, সেটা আসলেই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পর্যটক নির্ভরশীল আমাদের যারা ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি। তবে আমাদের চেম্বার অব কমার্স সেসব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে থেকে ক্ষতি উত্তরণে  সহযোগিতা করে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দাবিতে গণভোট আয়োজনে ভূমিকার জন্য গত ১৪ অক্টোবর অঞ্চলটির ৯ স্বাধীনতাকামী নেতাকে ৯ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয় স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট। রায় ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বিক্ষোভকারীরা বার্সেলোনাসহ কাতালোনিয়ার বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

সহিংস বিক্ষোভে পুলিশসহ শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। বিশেষ করে প্রতিদিন রাতে সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করাসহ রাস্তার পাশে থাকা আবর্জনার বাক্সগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এসিড ছুঁড়ে আগুন দিয়ে গাড়ি পুড়ানোরও অভিযোগ উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিপক্ষে।