কাজী মশহুরুল হুদা :

আমি আমেরিকায় একজন সংখ্যালঘু। তবে পার্থক্য হচ্ছে আমি একটি সভ্য সমাজে বসবাস করছি। এদেশেও উগ্রপন্থী রয়েছে, তারা গালিগালাজ দিতে পারে কিন্তু শরীর স্পর্শ করার সাহস পায় না। তারা চোখ রাঙিয়ে কথা বলতে পারে, কিন্তু ঘরবাড়ির ত্রিসীমানায় আসার সাহস পায় না। প্রশ্ন আসতে পারে- কেন সাহস পায় না? কারণ একটাই- এদেশে আইনের শাসন আছে। সঠিক বিচার আছে। আপনি বিচারপতি বা প্রেসিডেন্ট হন না অপরাধ করলে কোন মাফ নেই।

সম্প্রতি প্রিয়া সাহা নামে এক বাংলাদেশী হিন্দু নারী আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে নালিশ করে যে সাহায্য চেয়েছেন। তার অভিযোগ যে- পুরোপুরি অসত্য তা কিন্তু নয়! তবে আমি কয়েকটি বিষয়ে বিশ্লেষণ করব। তার শেষের কথাটি চরম সত্য। দেশ ভাগের পর থেকে এটাই হয়ে আসছে। কতিপয় অমানুষ (মুসলিম নামধারী) ব্যাক্তি নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পৈশাচিক আচরণে নিজেকে সবল মনে করে দুর্বল সম্প্রদায়ের প্রতি জোর খাটিয়ে অল্প পয়সার বিনিময়ে জমি, সম্পদ দখল করে নিয়েছে। বাড়ি-ঘর বিক্রি করতে বাধ্য করে। এমনও ঘটেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদেরকেও ধর্ষণ করেছে। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রিয়া সাহা বলেছেন, এগুলো সব সময় সরকারি দলের অর্থাৎ ক্ষমতাশিলদের ছত্রছায়াতেই হয় এবং এখনও হচ্ছে। কথাগুলো মিথ্যা নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে, বাড়ি ঘর লুট করে সংখ্যালঘুদের চাপ সৃষ্টি করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। এছাড়ও অন্যান্য কারণ রয়েছে। সেগুলো আমার আলোচনার বিষয় নয়।

আমি আলোচনা করব প্রিয়া সাহার বক্তব্যের উপর। তিনি একটি পরিসংখ্যান পেশ করতে চেয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে, অল্প কথার মধ্যে। একেবারে অপ্রস্তুতভাবে কথাগুলো বলতে গিয়ে তিনি আসলে ঘুলিয়ে ফেলেছেন। তার বলার ভঙ্গি দেখে বোঝাই গেছে তিনি নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন। বেচারি বিপদে পড়েছেন গুম, খুনের ভুল তথ্য দিতে গিয়ে। তবে আমার কাছে তার বক্তব্যের যে বিষয়টি খারাপ লেগেছে তা হচ্ছে তিনি ট্র্যাম্পকে খুশি করতে বা তার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকরী করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে মুসলিম ফান্ডামেন্টাল গ্রুপ কথাটি ব্যবহার করেছেন। তার বাড়ি ঘর জ্বলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারপরও তিনি দেশে থাকার আকুতি করেছেন। তার আকুতি দেখে ট্র্যাম্পও আপ্লুত হয়েছেন। তাইতো তিনি নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার হাত ধরে শান্তনা দিয়েছেন।

প্রিয়া সাহার শেষ কথা হচ্ছে- এই সব মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়।

এখন কথা হচ্ছে- বাংলাদেশে মুসলিম ফান্ডামেন্টালিষ্টদের কি এত বড় ক্ষমতা আছে? এ সরকারের আমলে এমন কাজ কি করা সম্ভব? এই সরকার কি আসলেই আশ্রয় দেয়? যেখানে সব ধরণের সন্ত্রাসী দৌঁড়ের উপর আছে, সেখানে কি এটা সম্ভব?

আমি বিশ্বাস করি না যে- প্রকৃত কোন মুসলমান অন্য ধর্মের কোন মানুষের উপর জুলুম করে, জমি দখল করে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না এবং যারা প্রকৃত মুসলিম তারা অন্যায়, অবিচার করতে পারে না। প্রকৃত পক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের যে অভিযোগ তা এক পক্ষ। আসলে সমাজে এধরণের অপরাধমূলক কাজ সব সময়, সব জায়গাতেই হচ্ছে। মুসলমানদের মধ্যেও হচ্ছে। এমনকি বেশি হচ্ছে। বাড়ির দেয়াল নির্মাণকে কেন্দ্র করে, জমির সিমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে কোন্দল প্রতিটি পাড়া মহল্লাতেই হয় এবং হচ্ছে। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ঘরের সুন্দর নারী দেখে যৌন হয়রানী, ধর্ষণ, সম্পদ লুট এগুলো করছে। প্রতি নিয়তই পত্রপত্রিকা খুললে দেখা যাবে। এমনকি মাদ্রারাস শিক্ষক তারই ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করে, আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। এটি আসলে সামাজিক সমস্যা। এটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা কোন্দল নয়। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই একই সঙ্গে একই পাড়তে বাস করে। তারা প্রত্যেই সমাজের অংশ, প্রত্যেকেই সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। স্কুলে কলেজে সর্বত্র একই সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাদের সন্তানরা পড়ালেখা করে। যে হামলা বা সমস্যা গুলো হয় তা সমাজের অংশ হিসেবেই হয়। দু’একটি ঘটনা ছাড়া অধিকাংশই সাধারণ কোন্দল। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায় অভিযোগটা করেন একটু বাড়িয়ে। ‘হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব’ বিষয়টি শুনলেই কেমন যেনো লাগে। এ দ্বন্দ্ব মুসলমানের সঙ্গে অন্য মুসলমানেরও রয়েছে। এটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। সুতারাং, বাংলাদেশে যে হিন্দু-মুসলিমদের দ্বন্দ্ব এটা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব নয়। বরং এটা বলতে দ্বিধা নেই যে- মুসলিমদের চেয়ে দেশে হিন্দু সম্প্রদায় বেশি সিকিউরিটি ভোগ করে। তাদেরকে মুসলমানরাই রক্ষা করে আসছে। যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম, পাঁচ ওয়াক্ত আযান হচ্ছে, রাষ্ট্র ধর্মও যেখানে ইসলাম, সেই দেশেই মসজিদের পাশে মন্দির। যেখানে পুজা হচ্ছে। আর সেই পুঁজাতে মুসলমানরাও অংশগ্রহণ করছে উৎসব উপভোগের জন্য। এমন দেশ পাওয়া কঠিন। তবে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের যে ঘটনাগুলো ঘটে তার কিছু অংশ অসৎ, অমানুষ, মুসলিম নামের জানোয়ারদের কাজ। এখানে ইসলামকে টেনে আনার কোন অবকাশ নেই। মুসলমানদের টেনে অহেতুক আরও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছেন তারা।

দেশের হুজুর, ওলামা সমাজ হিন্দুরে গালি দিতে পারে কিন্তু কখনও আঘাত করে না শারীরিক ভাবে। যারা করে তারা শুধু হিন্দুদের উপর নয়, সবার উপরেই করে। এধরেণর মানুষ শুধু মুসলিমদের মধ্যে নয়, সব ধর্মের মধ্যেই রয়েছে। ভারতের দিকেই চেয়ে দেখুন, প্রতি নিয়ত কত মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। সেখানে হিন্দুদের মধ্যেই দাঙ্গা হয়। গরু খাওয়া নিয়ে কতটা নির্যাতনই না সহ্য করে সে দেশের মুসলিমরা। এখন তো প্রায় ই শোনা যায় গরু খাওয়ার অপরাধে ভারতে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে।

আমাদের দেশে হিন্দুদের খাবারের বিষয়ে কোন কি বাধা নিষেধ আছে? তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারছে, খেতে পারছে। এমনকি তাদের বড় দুর্গা পুজার সময় রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে পুঁজা করতে দেওয়া হচ্ছে দিনের পর দিন। সেখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকদের আগমনও কম নয়। তারপরও কিছু বিষয় আছে। যেগুলো রাষ্ট্রের সমস্যা, মুসলমানদের নয়। যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমেরিকায় আইনের শাসন চলে। তাই এদেশে এমন কিছু দেখা যায় না।

আমাদের দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, প্রতিষ্ঠা পাক নৈতিক মূল্যবোদের …