গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে দ্বিগুণ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১৬টি কেন্দ্রের ফল প্রকাশ হয়েছে। এর সবকটিতেই এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার।

ফলাফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে পেয়েছেন ৪ লাখ ১০ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার পেয়েছেন১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট। ভোটের হিসাবে জাহাঙ্গীর বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে দুই লাখ ৩৭৯ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

এর আগে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির অধ্যাপক এমএ মান্নান। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৪২৫টি ভোট কেন্দ্রে একযোগে ভোট গ্রহণ অনষ্ঠিত হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষ ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে নানা অনিয়মের অভিযোগে ৯টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।

এদিকে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৭৩৬ জন হলে ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। এ নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রার্থী হলেও মূল লড়াই হয়েছে নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাজীপুরকে পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, আমি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার কথা মাথায় রেখে এ নগরীকে গড়ে তুলব। আশা করি, গাজীপুরসহ দেশবাসী আমাকে সহযোগিতা করবেন। মঙ্গলবার রাত পৌনে ১টায় বিজয়ের প্রাক্কালে প্রতিক্রিয়ায় গাজীপুরের নিজ বাসায় তিনি গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।

এদিকে জাহাঙ্গীর আলম যখন গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিলেন ঠিক সে মুহূর্তে কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থক তার বাসার নিচে উল্লাসে মেতে ওঠেন। অনেকে ফুলের তোড়া, ফুলের মালা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, এ শহর সবার। আজকের এ বিজয়ের আনন্দ আমি সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই। সবাই আমার সঙ্গেই থাকবেন প্রত্যাশা করি।

এর আগে ভোট গণনার সময়ে রাত ১১টার দিকে তিনি বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। এ সময় তিনি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিজয়ী করায় গাজীপুরবাসীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এদিকে জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচন সুষ্ঠুর দাবি করলেও বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার সকাল থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টঙ্গীতে নিজ বাসায় হাসান উদ্দিন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪শ’রও বেশি কেন্দ্রের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন এজেন্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে মর্মেও দাবি করেন হাসান।

হাসান সরকার বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের আন্দোলন চলবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাইরে থেকে ব্যালটে সিল মেরে ভেতরে এনে বাক্সে ভরা হয়েছে। এ নতুন প্রজন্মও জানল আওয়ামী লীগের চরিত্রটা কেমন। কেন্দ্র দখলকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়ে ধৈর্যধারণ করায় তিনি সব নেতাকর্মী ও এজেন্টকেও ধন্যবাদ জানান।

আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর। এ সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার। এতে ২৫ লাখের বেশি জনসংখ্যার বসবাস। সর্বশেষ গাজীপুর সিটিতে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে হারিয়ে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নান ১ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে মেয়র নির্বাচিত হন।

৩১ মার্চ তফসিল ঘোষণার ৮৬ দিন পর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হল। ১৫ মে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও ৩৬ দিন নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার পর আইনি জটিলতায় মাঝপথে আটকে যায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। পরে আপিল বিভাগের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিটি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হল।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গাজীপুর সিটির উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রচার চালিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তার বিভিন্ন পথসভায় নগরীর দুঃখ-দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে এর সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি। তারা মনে করেন, মানুষ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এখন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পালা। এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখন সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নের পালা।