পূণ্যভূমি সিলেটে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থককে নিয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি মাজারের মহিলা ইবাদতখানায় কোরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ দোয়া করে মহান আল্লাহ’র সাহায্য প্রার্থনা করেন।

সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত ও মাগরিবের নামাজ আদায় করেন খালেদা জিয়া। এরপর রাতে তিনি শাহপরাণ (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় দুই ওলির মাজার এলাকা লোকে-লোকারণ্য ছিল।

এর আগে সকাল সোয়া ৯টায় সিলেটের উদ্দেশে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে রওনা দেন খালেদা জিয়া। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি আলোচিত দুর্নীতি মামলার রায়কে সামনে রেখে খালেদা জিয়া সিলেটে মাজার জিয়ারত করেন।

ঢাকা থেকে সিলেট দীর্ঘ রাস্তায় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে কঠোর নিরাপত্তা দিয়েছে পুলিশ। ‘নিরাপত্তার জন্য’ বিএনপি চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা জানাতে রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি দলটির নেতাকর্মীদের। বন্ধ রাখা হয় রাস্তার দু’পাশের সব দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাধা উপেক্ষা করে রাস্তায় জড়ো হওয়া নেতাকর্মী ও উৎসুক জনতার ওপর বেশ কয়েক জায়গায় লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ; চালিয়েছে ধরপাকড়ও। ঢাকা থেকে নরসিংদী পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও ভিন্ন দৃশ্যপট ছিল কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেট পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তায়। খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের মুখে মুখে ছিল একটিই স্লোগান, ‘আমার নেত্রী, আমার মা—বন্দি হতে দেব না।’

গাড়িবহরকে স্বাগত জানানোর সময় নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারে অনেককে গ্রেফতার করে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। ‘সরকার উৎখাতের চেষ্টার’ অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অর্ধ-শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলাও করেছে পুলিশ।

নরসিংদীতে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান উদ্দিন মোলতা ও শহর সভাপতি গোলাম কবির কামালসহ ১১ জনকে আটক করা হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

মৌলভীবাজারে ১০ নেতাকর্মীকে আটকের কথা জানিয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার সফরকে সামনে রেখে সিলেটে ৩৭ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউসে পৌঁছে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেন খালেদা জিয়া। এ সময় সার্কিট হাউসের সীমানা প্রাচীরের পাশে সতর্ক প্রহরায় ছিল পুলিশ। সার্কিট হাউজে খালেদা জিয়া অবস্থানকালীন সময়ে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী বাইরে স্লোগান দিতে থাকেন।

এদিকে, দুপুরে সার্কিট হাউস ও শাহজালাল (রহ.) মাজার গেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। তবে বিকেল পৌনে ৩টার দিকে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান জামানের অনুসারী নেতাকর্মীরা পাল্টা শো-ডাউন দিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা সরে যায়।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর পর সিলেটে দলীয়প্রধানকে স্বাগত জানাতে ও একনজর দেখতে দুপুর থেকেই মাজার প্রাঙ্গণসহ নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশে জড়ো হন দলের হাজারো নেতাকর্মী। খালেদা জিয়ার গাড়িবহর নগরীর প্রবেশদ্বার চণ্ডীপুলে আসার পর নেতাকর্মীরা ‘খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় অনেকের হাতে বিএনপিপ্রধানের ছবি ও দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ দেখা যায়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কিছু ব্যানার-বিলবোর্ডও দেখা যায়।

এদিকে, সকালে গুলশান থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর রাজধানীর নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থামে। এ সময় খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদের পক্ষ থেকে শতাধিক কর্মী-সমর্থক।

গাড়িবহর সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বার হবিগঞ্জের মাধবপুর পৌঁছার পর পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। মাধবপুর গোলচত্বরে জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সালের সমর্থক, শায়েস্তাগঞ্জে হবিগঞ্জর পৌর মেয়র জি কে গউছের সমর্থক, বাহুবল, মিরপুর, আউশকান্দিতে সাবেক এমপি শেখ সুজা মিয়ার সমর্থকরা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানান। শায়েস্তাগঞ্জে তোরণ নির্মাণ ও রাস্তার পাশে মঞ্চ করে মাইকে স্লোগান দিয়ে খালেদা জিয়াকে বরণ করে স্থানীয় বিএনপি। শেরপুর কিবরিয়া চত্বরে বাধার মুখে হাজারো নেতাকর্মী অবস্থান নিলেও লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

সিলেটের গোয়ালাবাজার, তাজপুর, দয়ামীর ও রশিদপুরে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর ছবি সম্বলিত ফেস্টুন হাতে হাজার হাজার কর্মী সমর্থক স্লোগানে স্লোগানে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে অভ্যর্থনা জানায়। দক্ষিণ সুরমা চণ্ডীপুল এলাকায় পৌঁছালে শতাধিক মোটরসাইকেলের একটি বহর খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে এসকট দিয়ে সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেয়। বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতির কারণে মেন্দিবাগ থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত দুই মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে গাড়িবহরের প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগে।

খালেদা জিয়ার সফরকে স্বাগত জানিয়ে নগরীতে বেশকিছু তোরণ নির্মাণ করেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

সিলেট সফরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, শাহজাহান ওমর, বরকতউল্লাহ বুলু, ডা. জাহিদ হোসেন, আহমদ আজম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, শামা ওবায়েদ, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী প্রমুখ।

সিলেটের নেতাদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন, সিলেট জেলা সভাপতি আবুল কাহের শামীম, মহানগর সভাপতি নাসিম হোসাইন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এমএ হক প্রমুখ।