লস এঞ্জেলেসে কথা সাহিত্যিক শওকত আলীর স্মরণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রাইটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ক্যালিফোর্নিয়া এ সভার আয়োজন করে। লিটল বাংলাদেশের বাংলাদেশ একাডেমীর মিলনায়তনে এই প্রখ্যাত ঔপন্যাসিকের স্মরণে উক্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত আলী কলোনিয়াল বাংলা সাহিত্যকে কলকাতা থেকে ঢাকা কেন্দ্রীকতায় নিয়ে আসেন এবং মূলধারার সাহিত্য বিনির্মাণের অগ্রসৈনিকদের অন্যতম হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

উক্ত অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের সভাপতি কাজী মশহুরুল হুদা। শুরুতে শোক ও স্মরণ সভায় এই গুনিজনকে সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন- কবি মুকতাদির চৌধুরী তরুণ। সভায় অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সাংবাদিক লস্কর আল মামুন, বিশিষ্ট সাহিত্যানুরাগী ফিরোজ আলম, রিডার্স এণ্ড রাইডারর্স এর স্বত্তাধিকারী সাজেদ চৌধুরী ম্যাকলিন। বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ এম হোসেন বাবু। একুশে অনলাইন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জাহান হাসান ও বাংলাদেশ একাডেমীর পরিচালক জাহিদ হোসেন পিন্টু।

আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তরা বলেন, বাংলাদেশের ৬০’র দশকের গল্প, উপন্যাস বা কথাসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যাক্তিত্ব শওকত আলী ১৯৬৩ পিঙ্গল আকাশ থেকে ২০১১ পর্যন্ত মাদার ডাঙ্গার কথার মাধ্যমে তার সারাজীবনের চিন্তা চেতনার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন। আবর্তিত হয়েছে সাত চল্লিশে দেশ ভাগজনিত বিষাদ কিল্ট যন্ত্রণা ও আত্মদাহন এবং ব্যাক্তিগত জীবনের সংকট-সংগ্রাম। বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব ছিল তার অধিকাংশ উপন্যাসের ভেতর।

রাইটার্স এসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি কাজী মশহুরুল হুদা বলেন, রাইটার্স এসাসিয়েশন প্রবাসের ও দেশের কবি, লেখক, সাহিত্যিকের একটি সেতুবন্ধন। প্রবাসের লেখকদের অনুপ্রানিত ও চচ্র্চার ক্ষেত্র সৃষ্ট করা এবং দেশের সাহিত্যকদের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের একটি মাধ্যম।

উল্লেখ্য, বাঙালি সমাজব্যবস্থার ক্রম পরিবর্তন নিয়ে যেকজন লেখক কাজ করেছেন শওকত আলী তাদের অন্যতম। বিভিন্ন দশকে বাঙালি মধ্যবিত্তের চিন্তাধারার পরিবর্তনও উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। একাধারে লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষক শওকত আলী রেখে গেছেন প্রদোষে প্রাকৃতজন, দক্ষিণায়নের দিন আর পূর্বরাত্রি পূর্বদিনের মতো কালজয়ী উপন্যাস।
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শওকত আলীর জন্ম ১৯৩৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরে। ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক আবহে বেড়ে ওঠা শওকত আলীও জড়িত ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিতে। দেশভাগের পর ১৯৫২ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে চলে আসেন শওকত আলী। সেখানেই তাঁর হাতেখড়ি হয় লেখালেখিতে।
শওকত আলীর কর্মজীবন শুরু ১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাতে সাংবাদিক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন দিনজাপুরের একটি স্কুলে। ১৯৬২ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন শওকত আলী। এর আগে বিভিন্ন পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে লেখালেখি চালালেও ঢাকায় আসার পর লেখালেখির প্রসার ঘটে তার। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে খ্যাতির চুড়ায় ওঠেন শওকত আলী। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস প্রদোষে প্রাকৃতজন। উপন্যাসত্রয়ী দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত এবং পূর্বরাত্রি পূর্বদিনের জন্য শওকত আলী পেয়েছেন ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার। তাঁর এসব উপন্যাসে মূলত ষাটের দশকে বাঙালি মধ্যবিত্ত এবং সমাজব্যবস্থায় ধ্যান-ধারণা, চিন্তা এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের ধারা উঠে এসেছে।
সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান শওকত আলী। ১৯৯০ সালে ভূষিত হন একুশে পদকে। বিংশ শতাব্দিতে বাংলা ভাষাভাষি লেখকদের মধ্যে শওকত আলী ছিলেন অন্যতম।